আজ শনিবার, , ২৪ জুন ২০১৭ ইং

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বাঙালির নাট্য সৃজনের মৌলিক ও স্বতন্ত্র প্রয়াস কি?

প্রকাশিত: ২০১৭-০৫-২১ ১৬:৪১:০৮

হিতাংশু ভূষণ কর

আমি এমন একটা দেশে জন্মগ্রহণ করেছি, যে দেশটি রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। বাঙালির নাট্য ইতিহাস ও মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা ভাবতেই এমত একটি ধারণা হলো যে বিশ্বপ্রেক্ষাপটে বাঙালির নাট্য সৃজনের মৌলিক এবং স্বতন্ত্র প্রয়াস কি সে সম্পর্কেতো কিছু কথা বলা যেতেই পারে। বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আমাদের নাটকের স্বাতন্ত্র্য কোথায়? আমরা কিভাবে ব্যতিক্রমী ও সমৃদ্ধ শিল্পধারার উত্তরাধিকারী হয়ে উঠেছি? বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ ফসল নাটক একথা বিবেচনায় রাখলে মনে প্রশ্ন জাগে সেই শ্রেষ্ঠত্ব কোথায়? কোন বিশিষ্ট গুণের জন্য নাটককে মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ অর্জন বলব? তবে কি এজন্যই শ্রেষ্ঠ বলছি যে একটি স্বাধীন দেশের নাট্যচর্চায় উন্নত দেশের নাট্যধারার অনুকরণে একটি নতুন নাট্যধারা হয়ে বাঙালির নাট্যভাবনার দিগন্তকে সম্প্রসারিত করেছে?

হ্যাঁ, এই কথায় আংশিক সত্যতা রয়েছে। বিশ্বনাটকের প্রভাব সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের নাট্যকর্মীদের উপরও পড়েছিল কথা সত্য। কিন্তু তার মানে এই নয় যে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তীকালের বাংলাদেশের নাটক ইউরোপিয় নাটকের অনুকরণজাত শিল্প ফসল। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আমাদের নাটকের মৌলিক অর্জনটি হলো বিশ্ব নাটকের ভালোটুকু গ্রহণ করে নিজের দেশের শিল্পভূমিতে নাটকের নিজস্ব আঙ্গিকের অন্বেষণ। আর এখানেই বাঙালির হাজার বছরের নাট্য অভিযাত্রার সঙ্গে আধুনিক বাংলা নাটকের শিল্প বিনির্মাণের সংশ্লেষণ ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ব নাটক ও সংস্কৃতি ভাবনার আলোকে আমার ভাবনাগুলো উপস্থাপন করব আপনাদের সামনে।

আমার কথাগুলোকে সন তারিখ কিংবা তত্ত্বের জটিল জালে আবদ্ধ রাখতে চাই না। আমি চাই আমাদের পারস্পরিক জিজ্ঞাসার ভেতর দিয়ে এমন একটি সত্যে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করব, যেখানে ব্যাপক বিতর্ক থাকবে কিন্তু বাংলাদেশের হাজার বছরের সমৃদ্ধ নাট্য ইতিহাসের জন্য ভালোবাসার কমতি থাকবে না। স্বদেশের শিল্পভূমিতে দাঁড়িয়ে বিশ্বপানে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সেই ভালোবাসাটি তৈরি হবে। বিশ্বের যা ভালো তা আমরা গ্রহণ করব। বিশ্বের তাবৎ নাট্যকর্মীদের সঙ্গে আমাদের যে আত্মিক সংলগ্নতা ঘটে তা শুধু ভৌগোলিক দূরত্বই ঘুচিয়ে দেয় না, শিল্পের মানসভুবনকেও পরস্পরের সঙ্গে সংলগ্ন ও সম্প্রসারিত করে। নাটকের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বিশ্বপ্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নাটকের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে গেলে এটাই মনে হয় যে, বাংলাদেশ পর্বের বাঙলা নাটকের অভিযাত্রা ইতিহাস, সময় ও কালের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেই তা আধুনিক। তবে এ কথাটিও মনে হতে পারে যে ‘আধুনিক’ শব্দটি যতটা না সময়কে ততোটা ইতিহাসকে অঙ্গীকৃত করে না। কিন্তু ‘আধুনিকতাবাদ’ এই তাত্ত্বিক পরিভাষার সঙ্গে বর্তমান বিশ্ব নাট্যের অভিযাত্রাকে মিলিয়ে দেখলে এ কথা স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয় যে, নাটক সত্যিকারেরই একটি আধুনিক শিল্প।

কালে কালে অতীতের সঙ্গে বর্তমান সময়ের শিল্প-সাহিত্যের পার্থক্য বুঝাতে আধুনিকতা চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু নাটকের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে নাটক সর্বকালেই সাম্প্রতিক সময়কে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে। এমন কি একই কালের নাট্যকার হয়েও যুগগত বিবেচনা ও প্রাগ্রসর চিন্তার কারণে একজন আরেকজনের থেকে স্বতন্ত্র থেকেছেন। প্রত্যেক কালেই সেকালের নাটক আধুনিক। নাটক এজন্য সর্বকালেই আধুনিক। কারণ নাটকতো অগ্রসরমানতাকে ধারণ করেই রচিত ও পরিবেশিত হয়। এজন্যই কথাটি বলতে চাইলাম যে, নাটক প্রাগ্রসর চিন্তারই শিল্পফসল। প্রাগ্রসর চিন্তা মানেই আধুনিক মননশীলতার প্রতীক। সময় থেকে এগিয়ে থাকে বলে জনপ্রিয় এবং বিনোদনমূলক হওয়া সত্ত্বেও নাটকের সঙ্গে সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যক্তি কিংবা সামষ্টিক বিরোধের সূত্রপাত ঘটে থাকে। একমাত্র নাটকই সমাজের সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়ে থাকে। নাটকের মধ্যে আধুনিকতার অন্যতম চরিত্র ব্যক্তি, সত্তা, একক এবং আত্মসম্পূর্ণতার উদ্বোধন ঘটেছে। একই সঙ্গে নাটক আধুনিক এবং উচ্চশ্রেণির সমাদৃত শিল্প মাধ্যম হয়েও আধুনিকতার আরেকটি ধারণা উচ্চ ও নিম্ন সংস্কৃতির বিভাজনকে স্পষ্টতই প্রত্যাখ্যান করেছে।

আমরা দেখেছি নাটকের উদ্ভবকাল থেকেই সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে জনগণের শিল্প হিসেবেই নাটকের প্রতিষ্ঠা ঘটেছে। মিশরের ধর্মীয় কৃত্যনির্ভর ওসিরিস প্যাশন প্লে, সিরিয়ার তাম্মুস, গ্রিসের কৃষিকেন্দ্রিক জীবনধারা ও দিওনুসুসের উৎসব থেকে উৎসারিত গ্রিক ট্রাজেডি, প্রাচীন ভারতের সংস্কৃত নাটক, কৃষিকেন্দ্রিক শিবোৎসবকে ঘিরে রচিত বাংলা নাটক সবখানেই মানুষের শ্রেণিবিহীন অংশগ্রহণের প্রমাণ রয়েছে। নাটক তাই সবসময়েই উচ্চ কিংবা নিম্নবর্ণীয় সংস্কৃতির ঘেরাটোপে বন্দী সামাজিকগণের নিকট সাংস্কৃতিক বিভাজনবিহীন একমাত্র ‘কমন’ শিল্প মাধ্যম হিসেবে সক্রিয় থেকেছে। উদ্ভবকালের পর থেকেই সুদীর্ঘ বিবর্তনের ধারায় জনগণের মধ্যকার সাংস্কৃতিক পার্থক্য দূর করার ক্ষেত্রে নাটক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমরা দেখেছি যে একটি সংস্কৃতির সঙ্গে আরেকটির গুণগত পার্থক্য সূচিত করে বলেই এই বিভাজন নয়। এর সঙ্গে সামাজিক উচ্চনীচ ভেদরেখাটিও দৃশ্যমান। আর এজন্যই সংস্কৃতি চর্চার উপাদান-উপকরণের সঙ্গেও উচ্চ কিংবা নিম্নবর্ণীয় সংস্কৃতির চিহ্ন লেগে রয়েছে। উচ্চ শ্রেণির সংস্কৃতি কিংবা সাংস্কৃতিক ধারণার সঙ্গে সকল শ্রেণির মানুষের সম্পর্ক নেই বলেই তা উচ্চ শ্রেণির কিংবা উচ্চ সংস্কৃতি বলে বিবেচ্য। সাধারণ জনগণের আশা আকাক্সক্ষার সঙ্গে এ ধরনের শিল্প সংস্কৃতির একটি দূরতর সম্পর্ক রচিত হয়। সেই আরম্ভের কালেই সংস্কৃতির এই ভেদটি ঘুচিয়ে দিয়েছে নাটক। নাটকই সকল শ্রেণির মানুষের পড়া ও দেখার সম অধিকার সংরক্ষণ করে।

ভারতীয় নাটকের উদ্ভব নিয়ে ভরতমুণি তাঁর নাট্যশাস্ত্র গ্রন্থে যে বিবরণ দিয়েছেন, তাতেও দেখা যায় প্রাচীন ভারতীয় নাট্যতাত্ত্বিকেরা সামাজিক শ্রেণি বিভাজন ঘুচিয়ে দেয়ার জন্য নাটকের দ্বারস্থ হয়েছেন। সেই পূর্বকালে উচ্চশ্রেণির লোকেরাই কেবল বেদ অধ্যয়ন করতে পারতেন। বেদ অধ্যয়নে শূদ্রের কোন অধিকার ছিল না। ব্রহ্মা তখন ঋকবেদের ‘পাঠ’ যজুর্বেদের ‘ক্রিয়া’ অভিনয়, সামবেদের ‘গান’ এবং অথর্ববেদের ‘রস’ এইসব উপাদানের সংযোগে নাট্যের সৃষ্টি করলেন যা পঞ্চম বেদ নামে পরিচিতি পেল। আর এই নাট্যাভিনয়ে সকলের সমান অধিকার দেওয়া হল। কিন্তু সংস্কৃত নাটকের শ্রেণিকরণে কিংবা চরিত্র কিরূপ হবে তা নির্ধারণ করতে গিয়ে ভরত যে কথা বলেছেন সেখানে শ্রেণিগত বৈষম্যের কথা রয়ে গেল। কারণ সংস্কৃত নাটক ছিল সম্ভ্রান্ত লোকের জন্য। কিন্তু বাঙলা নাটক ছিল সকল মানুষের জন্য। বাঙালির কাছে নাটক ছিল উচ্চ কলার অঙ্গ। সংস্কৃত নাটকের উল্লেখযোগ্য কোন প্রভাব বাঙলা নাটকের উপর ছিল না। কারণ বাঙালি নিজস্ব শিল্পরুচি ও দেশাচারকে অঙ্গীকৃত করে নাটক রচনা করেছে এবং অভিনয় করেছে। বাঙালি স্বাধীন মনোবৃত্তি সম্পন্ন জাতি এবং তাদের শিল্পকলা স্বাধীন মনোবৃত্তিরই প্রমাণ।

বাঙালির নাট্যভাবনার উৎসে যে কৃত্য ছিল, তা কৃষি জীবনের পাশাপাশি বাঙালির বাণিজ্য প্রবণতাকেও প্রকটিত করেছে। আর বাঙালির নাট্যভাবনা সেই শুরুর কাল থেকে হাজার বছর ধরে সাধারণ মানুষকে ঘিরেই বিকশিত হয়েছে। কারণ বাঙালির থিয়েটার হলো বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আনন্দ বিনোদনের মাধ্যমে। সংস্কৃত নাট্যতত্ত্ব থেকে বাঙালির এই স্বতন্ত্র শিল্পতত্ত্বের বিনির্মাণ ঘটেছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে। কৃষি তাদের মৃত্তিকা লগ্ন করেছে আর বাণিজ্য তাদের বাইরের শিল্প সংস্কৃতি আত্মস্থ করতে শিখিয়েছে। বাঙালি বণিকরা সিংহল, চীন, জাপান, সুমাত্রা পর্যন্ত ভ্রমণ করেছে। আমাদের মঙ্গলনাট কিংবা আখ্যানের সেই বিখ্যাত চরিত্র ধনপতি চাঁদ সওদাগর কিংবা কিচ্ছাকথনের রাজপুত্রদের সমুদ্র গমন, বিখ্যাত সওদাগরের গল্প তার প্রমাণ। বাংলাদেশ আর্য শাসনকার্যের আওতায় আসার পূর্বেই শিল্পকলা, নাট্য ও কাব্য চর্চা করেছে। ভরতের সময়ের পূর্ব থেকেই অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব কাল থেকেই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাঙলা নাট্যের ব্যাপক প্রচলন ছিল বলেই ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্র গ্রন্থে বাঙালির নাট্যরীতির উল্লেখ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাঙালির সহস্র বছরের এই নাট্যভাবনা বিকশিত হয়েছিল একটি জাতির সামগ্রিক জনপদের অংশ রূপে।

প্রাচীন বাঙলার শিবোৎসবকেন্দ্রিক নাটক, বৌদ্ধ সংস্কৃতি প্রভাবিত নাট্যচর্চা এবং দীর্ঘ ব্যাপ্ত মধ্যযুগের আখ্যান পরিবেশনার মধ্যে বাঙালির নাট্যচিন্তা পরিপুষ্ট হয়েছে। আর এর সবকিছুই সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সম্পূর্ণ হয়েছে। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে শুধু ভারতবর্ষে কিংবা প্রাচীন বাঙলায়ই নয়, প্রাচীন গ্রিসের নগর রাষ্ট্র ও এথেন্সও নাট্য প্রযোজনার দায়িত্ব পালন করত। এজন্য একজন আর্কন বা ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হতো। যে সকল দরিদ্র দর্শক টিকেট কিনতে পারত না রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাদের টিকেটের মূল্য পরিশোধ করা হতো। কিন্তু ধনিক শ্রেণির উচ্চমূল্যে টিকিট ক্রয় করতে হতো। ধনি-দরিদ্রের ভেদাভেদ ঘুচিয়ে সেই শুরুর কালেই নাটক সমগ্র জনগোষ্ঠীর শিল্প হয়ে উঠতে থাকলো। শুধু নাট্য প্রযোজনায় নয়, গ্রিক নাটকের শরীরেও সমকালকে অঙ্গীকৃত করলেন নাট্যকারগণ। প্রাচীন গ্রিসের ধর্মীয় কিংবা পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বন করে নাটক রচিত হলেও সেই পুরাণের শরীরে সাম্প্রতিক কালের আশা, আকাক্সক্ষা, বেদনা, সময়ের ভাঙন-গড়নের চিহ্ন লেগে রইল। আর তখনই পুরাণ হয়ে উঠল কালের বিবেচনায় আধুনিক। কিন্তু বিবাদ ঘটল এখানেই। কারণ নাটক যৌথ প্রয়াসে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে।

নাটকের মাধ্যমে খুব দ্রুতই জনসচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব। আর তাই নাট্যকারগণ যখন সমকালের জিজ্ঞাসাকে তুলে ধরেন নাটকে, তখন দর্শক নানাভাবে প্রভাবিত হয়। কিন্তু নাট্যকারদের এই নবচিন্তার সঙ্গে রাষ্ট্র এবং সামাজিকগণের বিরোধ সূচিত হয়। এজন্য রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের সঙ্গে আদর্শিক বিরোধ সূচিত হওয়ায় সে সময়ের প্রিয় নাট্যকার এস্কিলাসকে মেসিডোনিয়ায় স্বেচ্ছা নির্বাসনে যেতে হলো। এস্কিলাসের ওরিস্টিয়ান ট্রিলোজি নাটকে ওরেস্তেসের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এথেন্সের বিচার ব্যবস্থাকে সূক্ষ্ম বিদ্রুপ করা হয়েছে। নাটকে সাধারণ মানুষের কথা বলে, যুক্তির আলোকে ধর্মীয় কাহিনীর ব্যাখ্যা করে ইউরিপেদেস জনপ্রিয় হলেন কিন্তু রাষ্ট্রপ্রিয় হলেন না। তিনিও মেসিডোনিয়ায় রাজনৈতিক নির্বাসনে গেলেন। স্বদেশে থেকেও নিজের রচিত ট্রাজেডির চরিত্রের মতই করুণ জীবন কাটাতে হয়েছিল শ্রেষ্ঠ ট্রাজেডি রচয়িতা সফোক্লেসকে। ধর্মীয় আগ্রাসনের হাত থেকেও নাটকের মুক্তি মেলে নি।

এই প্রসঙ্গে শুধু প্রাচ্যের নন, পৃথিবীর একজন মহান মানুষ গৌতম বুদ্ধের কথা বলবো। গৌতম বুদ্ধও তাঁর বৌদ্ধজাতকের জন্মান্তরের গল্পে চৌদ্দ প্রকার মানুষ থেকে তাঁর অনুসারীদের সাবধানে থাকতে বলেছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম শ্রেণিভুক্ত হলো তারাই যারা নাটকের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর ধর্মনির্দেশনায়, নাটকের সঙ্গে সম্পর্কিতদের থেকে বিযুক্ত থাকার নির্দেশনা এজন্য দিয়েছিলেন যে নাটক ধর্ম থেকে মানুষের চিত্তকে আলাদা করে ফেলে। শুধু নাটক নয় অন্যান্য সুকুমার শিল্প থেকেও তাঁর অনুসারীদের বিযুক্ত থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন বুদ্ধ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো এই নির্দেশনা দিতে গিয়ে বুদ্ধ সেকালের নাটক সম্পর্কে, নাটকের প্রয়োগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করেছেন।

এই বিবরণে আমরা এমত একটি প্রত্যয়ে পৌঁছাতে পারি যে নাটকের সাংগঠনিক শক্তি এবং সচেতনতা তৈরির বিষয়টি রাষ্ট্র এবং ধর্ম সবসময়েই সন্দেহের চোখে দেখত। শুধু যে প্রাচীনকালে তাই নয়, কলোনিয়াল আমেরিকান কংগ্রেস আইন করে নাট্য প্রযোজনা নিষিদ্ধ করেছিল। কারণ সেই সময়ের ব্রিটিশরা কলোনিয়াল আমেরিকায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নেটিভদের কোন অসন্তোষ যাতে দানা বেঁধে উঠতে না পারে এই আশঙ্কায় নাটক নিষিদ্ধ করেছিল। তাই নাটক সব সময়েই সাম্প্রতিক এবং সাম্প্রতিক বলেই আধুনিক। জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত, জনগণের জন্য রচিত এবং জনগণের বিনোদনের মাধ্যম নাট্যশিল্পের সঙ্গে এভাবেই ক্রমাগত রাষ্ট্র ও প্রশাসনের বিরোধ বাড়তে লাগল। একবিংশ শতকে এসেও, সারা বিশ্বে যখন বিশ্বনাট্য দিবস পালিত হয় তখনও নাটক, যাত্রা চলচ্চিত্র শিল্পের উপর সেন্সরশিপ কিংবা প্রশাসনের দীর্ঘ নখের আঘাত এসে লাগে। কিন্তু ঐ যে শুরুতেই বলেছি যে, নাটকের গতিময়তা ও সমাজ মনস্কতার প্রবলতার কাছে আর সব কিছু নতি স্বীকারে বাধ্য হয়েছে। নাটকের এই গণসংলগ্নতাই এর প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠেছে বিশ্বব্যাপী।

আমি আগেই বলেছি যে, সমাজে উচ্চ ও নিম্ন সংস্কৃতির যে বিরোধ তা সামাজিক শ্রেণিবৈষম্যের কারণেই ঘটে। সমাজে কোন ব্যাপক অভিঘাত না লাগলে এই ভেদরেখা ঘুচে না। এই অভিঘাত কোন যুদ্ধ কিংবা অন্য কোনো গণজাগরণেই সম্ভব। বিশ্বনাটকের ইতিহাস দৃষ্টে আমরা পাই বিশ্বযুদ্ধ পূর্বকালের ও বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালের বিশ্বনাটক, বিশেষ করে আমেরিকান, ব্রিটিশ এবং জার্মান নাটকে যে ‘নিউ ওয়েভ’ তৈরি হয়েছে তা যুদ্ধেরই ফল। জীবনবোধ, মূল্যবোধ এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত এসকল ধারণার পরিবর্তন ঘটে যুদ্ধ পরবর্তীকালের সমাজ ব্যবস্থায়। যেমন পরিবর্তন ঘটেছে ১৯৭১ সনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর বাঙালির সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানসিক গঠনে। যার অভিঘাত লেগেছে বাঙালির সংস্কৃতি ভাবনা ও মূল্যবোধে। আমরা লক্ষ করি যে এ ধরনের অভিঘাত থেকেই শিল্প, সাহিত্য, নাটক কিংবা সঙ্গীতের গড়ন গঠনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে।

বিশ্ব নাটকের একটি সামগ্রিক পাঠ বিবেচনায় রাখলে আমরা দেখতে পারি যে, সাম্প্রতিক বিশ্ব নাটকের গতি প্রকৃতির সঙ্গে সংস্কৃতির নির্মাণ পুনর্নির্মাণ একটি সম্পর্ক তৈরি করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নাটক নিয়ে যে ভাবনা চিন্তার অভিযাত্রা সূচিত হয়েছে তাতে বিভিন্ন নাট্যতত্ত্বের উত্থান ঘটেছে। সংস্কৃতির উচ্চ-নীচ তত্ত্বের প্রতিষ্ঠার পর এলিটদের সংস্কৃতির সঙ্গে জনপ্রিয় অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির পার্থক্য সূচিত হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ‘ফোক কালচার’ নামে চিহ্নিত হয়। ঐতিহ্যবাহী নাটক লোকনাটক আখ্যা পায়। এভাবেই ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক নাট্যচর্চার মতাদর্শিক পার্থক্য সূচিত হয়েছে। শিল্প শিল্পের জন্য, না শিল্প জীবনের জন্য, এই দ্বিবিধ মতবাদের ঘূর্ণিপাকে ঘুরতে থাকেন আধুনিক তাত্ত্বিকগণ। ক্রমশ প্রতিষ্ঠা পেতে থাকল শিল্প শিল্পের জন্য এই তত্ত্ব।

অথচ সত্য এই যে মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজনেই নাটকের উদ্ভব ঘটেছিল। শিকারজীবী গুহাবাসী মানুষেরা পশু শিকারের পর মৃত পশুর আচরণ অনুকরণ করে শিকারের যে বিবরণ উপস্থাপন করত তার সঙ্গে একটি যাদুবিশ্বাসের সমন্বয় ঘটল এভাবে যে এতে তাদের শিকার আরও ভাল হবে। এর সবটাই ঘটেছিল জীবিকার প্রয়োজনে। শিকারের ঘটনা অনুকরণ করে যে ঘটনা শিকারীরা উপস্থাপন করেছিল তা ছিল গুহাবাসী মানুষের কৃত্যের অনুষঙ্গে যে কৃত্য ছিল জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। শিল্প সেখানে মূল বিবেচনায় ছিল না। প্রয়োজনটাই হয়ে উঠেছিল মুখ্য। একসময় প্রয়োজনের সঙ্গে বিনোদন নাটকের অঙ্গে সংযুক্ত হয়। প্রয়োজন থেকে নাটকের যে অভিযাত্রা সূচিত হলো তার সঙ্গে বিনোদন সংযুক্ত হয়ে নাট্য একসময় জনগণের প্রাণের শিল্প হয়ে উঠল। সমাজের বিচিত্র টানাপড়েন, ভাঙন, মানবিক সম্পর্কের সৃষ্টি-বিনষ্টিকে অঙ্গীকৃত করে নাটক বিশেষভাবে আপামর মানুষের শিল্প হয়ে উঠল। এই শিল্প শুধু বিনোদিত করলো না মানুষকে নতুন কালের অগ্রযাত্রাকে ধারণ করতে শেখাল। নাটকের ভেতর দিয়ে যে যূথবদ্ধ চেতনার প্রতিষ্ঠা ঘটল তার সঙ্গে কালে কালে নাটকের শিল্পগত প্রেরণা যুক্ত হয়ে মানুষকে সংঘবদ্ধ করে এবং প্রতিবাদী করে তোলে। এবং দর্শককে যুক্তিবাদী করে তোলে। দর্শক-অভিনেতার পারস্পরিক অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে নাটক ক্রমাগত জনগণের হয়ে ওঠে। সত্যকে প্রতিষ্ঠার বাসনা কিংবা সুন্দরের অন্বেষণে নাট্যকারদের ভাবনার সঙ্গে অসুন্দর এবং অকল্যাণের স্পষ্ট বিরোধটি দর্শকদের চিনতে শিখিয়েছে নাটক। অভিনীত চরিত্রের ভেতর দর্শক নিজেকেই দেখতে পায়। নাটক দেখতে এসে সমাজ কিংবা ব্যক্তির ত্রুটি কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার একটা স্থান খুঁজে পায় দর্শক। নাটক একটি জীবন্ত শিল্প মাধ্যম বলেই উদ্ভবের কাল থেকেই অনবরত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে একালে পৌঁছেছে। নাটক তাই খুব বেশি আধুনিক শিল্প এবং কোনভাবেই সামাজিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন নয়।

সময়ের বিবেচনায় আধুনিক বিশ্ব নাটকের এই অভিঘাতগুলোর ব্যাপক প্রভাব এসে পড়ে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের মাধ্যমে। এর প্রভাবে যে নাট্যচর্চার বিকাশ ঘটে তাতে স্বদেশ ও বিশ্ব নাট্যের সংশ্লেষণ ঘটে। সাম্প্রতিক কালের থিয়েটার চর্চার সঙ্গে এই সময়ের পরিবেশ, শিল্পরুচি ও কারিগরি নানান মাত্রার সংশ্লেষণ ঘটেছে। মিডিয়ার ব্যাপক বিস্তার এবং জনগণের উপর দ্রুত প্রভাব বিস্তারকারী মিডিয়ার কল্যাণে বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতি ও নাট্যে পরিবর্তন সূচিত হয়। এখন টেলিভিশনে যে প্যাকেজ নাটক চালু হয়েছে তাতে সংস্কৃতির ভাল-মন্দ সকল ভেদাভেদ নির্বিচারে ঘুচিয়ে দিয়ে একটি ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। এই ইন্ডাস্ট্রির মূল প্রতিপাদ্য মুনাফা অর্জন।

এরও একটি অভিঘাত বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকে লেগেছে। বর্তমান বিশ্বের টেকনোলজির ব্যাপক বিস্তারের ফলে থিয়েটার অ্যাপ্রোচের ধরণও যাচ্ছে পাল্টে। একইসঙ্গে বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে রাজনৈতিক অর্থায়নের বিপুল বিস্তারের কারণে সামগ্রিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটছে। তারও প্রভাব থিয়েটারে লেগেছে। ফলে নাটকের মাত্রাগত পরিবর্তনেও যেমন ভিন্নতা সূচিত হয়েছে তেমনি আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে। আমার এই ছোট পরিসরের লেখায় একথাটাই বলতে চাইছি যে, মূল্যবোধের যে অবক্ষয় তার রোধে নাটক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

আজ বিশ্ব সমাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, পারিবারিক বন্ধন, পরিবার নামের সংগঠনের ঐতিহ্যিক ধারণায় ব্যাপক ভাঙন ধরেছে। সামাজিক সংগঠনগুলো ভেঙে পড়েছে। সমাজ ভাঙছে। এর থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে নাটক। সর্বকালেই নাটক বিনোদনের পাশাপাশি সমাজ সংগঠনের মূল্যবোধ বিনির্মাণে ভূমিকা রেখেছে। হাজার বছর ধরে নানা নামে নানা আঙ্গিকে পরিবেশিত হয়ে বর্ণনাত্মক বাঙলা নাট্যের মধ্যে সমাজের সংহতি রক্ষার আবেদন দেখা যায়। সমাজের স্তরগুলোতে সাম্য স্থাপন এবং পরিবারের রোধে একান্নবর্তী পরিবারের কথা বলা আছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী নাট্যে। আধুনিকতার নামে মানুষ যত বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিকতায় চলে যাচ্ছে সমাজ ও পরিবার নামের প্রতিষ্ঠানগুলোও ততই ভাঙনের সম্মুখীন হচ্ছে।

মহাভারত কিংবা রামায়ণের পারিবারিক বন্ধনের শিক্ষাটাই ভিন্নভাবে বাঙলা আখ্যানে সমন্বিত হয়ে সমাজের গড়ন গঠনের ভূমিকা রাখছে। বাঙালির আখ্যানে ব্যক্তির একক বিকাশের ভেতরেও পারিবারিক বন্ধনের প্রভাব রয়েছে। আমাদের অষ্টকগান, আদ্যের গম্ভীরা, আখড়াই, কথানাট্য, কুশান গান, কিচ্ছা পালা, কৃষ্ণযাত্রা বা কৃষ্ণলীলা, গম্ভীরা, গাজীর গান, গীতিকা, ঘেঁটু গান, ঘেটু যাত্রা, কবিগান, জাগের গান, জারীগান, ঝাপান গান, মনসা যাত্রা, ধামাইল, নাথ গীতিকা, যুগীর গান, বোলান গান, ভাদু গান, রাম লীলা, যক্ষ গান, ভাসান যাত্রা, মাদার গান, পদ্মা নাচারী, বিষহারী পালা, মৈয়মনসিংহ গীতিকা প্রভৃতি আসরকেন্দ্রিক পরিবেশনায় এই সমন্বিত সামাজিক গঠনের পরিচয় বিধৃত। হাজার বছর ধরে বাঙলা নাটক এভাবেইে ঐতিহ্য ও সমাজ থেকে শক্তি সঞ্চয় করে নিজেকে তৈরি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাতে বাংলাদেশে যে নাট্যধারার সূচনা ঘটল তা মূলত বিশ্বনাট্যের শিল্পশৈলী ও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও আখ্যানের সমন্বিত রূপ। তবে আজ, স্বাধীনতার ৪৩ বছরে এসে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের যে প্রেরণায় এদেশের নাট্য চর্চার উত্থান ঘটেছিল তা ক্রমশই কক্ষচ্যুত হয়ে পড়েছে। তা কি শিল্প সাফল্যে পৌঁছার আত্মতৃপ্তি? এই সময়ের বাঙলা নাটকের প্রেক্ষাপটে উত্তরটা জানা জরুরি।

মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে বিভিন্ন থিয়েটার আন্দোলন গড়ে উঠেছে। ঢাকা থিয়েটারের বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার আন্দোলন এবং আরণ্যকের মুক্ত থিয়েটার আন্দোলন সেই সময়ে নাট্যচর্চায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নিকট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে গ্রাম থিয়েটার এবং মুক্ত থিয়েটার আন্দোলন সারাদেশে ভাল নাটক মঞ্চায়নের লক্ষ্যে কাজ করেছে। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী তাদের কেন্দ্রীয় ও জেলা শাখা সমূহের থিয়েটারকর্মীদের মাধ্যমে একটি সমাজতান্ত্রিক শোষনহীন সমাজের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার লক্ষে এক কথায় মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাদের স্বকীয় ভূমিকা নাট্য আন্দোলনকে আরও বেগবান করেছে| বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে একথা বলা যায় যে এই নাট্য আন্দোলন আরও বেগবান করা প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশের ৪৩ বছরের থিয়েটারের ইতিহাসে নানা প্রকার নিরীক্ষাধর্মী থিয়েটার চর্চা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি কেন্দ্রিক একাডেমিক থিয়েটার চর্চা, পরিবেশবাদী থিয়েটার মুভমেন্ট, স্টুডিও থিয়েটার, রেপারটরি থিয়েটার এমনি আরও কিছু নিরীক্ষাধর্মী থিয়েটার চর্চার কথা বলা যায়। যদিও এর অনেকগুলোই, বিশেষ করে পরিবেশবাদী থিয়েটার আন্দোলন শেষ পর্যন্ত টিকে নি।

এই প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয় যে, যা কিছু নিরীক্ষা হয়েছে তার অধিকাংশই রাজধানী কেন্দ্রিক। কখনও কখনও বিভাগীয় শহরগুলোতে এসকল নিরীক্ষার প্রয়োগ ঘটেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগণের নিকট এই নিরীক্ষার সুফল পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এমন কি মুক্তিযুদ্ধের সফল নাটক বাংলাদেশের সকল স্তরের জনগণের নিকট একটি আধুনিক প্রপঞ্চ হিসেবে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তাই বাংলাদেশের আধুনিক থিয়েটার চর্চার সুফলভোগী ঢাকাবাসী নাট্যদর্শক সমগ্র দেশবাসী নয়।

আলোচনার এই পর্যায়ে এসে আমার বক্তব্যের সঙ্গে একটা বিষয় সংযোজন করতে চাই তা হলো মুক্তিযুদ্ধের পরই বাংলাদেশের নাট্যকার, নির্দেশক কিংবা নাট্যতাত্ত্বিকগণ কর্তৃক বাঙালির নিজস্ব শিল্প নন্দনভাবনার অন্বেষণ প্রয়াস। মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায় উৎসারিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও স্বদেশজাত শিল্পভাবনার প্রেরণায় ইউরোপীয় নাট্যরীতির প্রচল ভেঙে বেরিয়ে আসার তাগিদ অনুভব নাট্যকার ও নির্দেশকগণ। তাই বাঙালির নাট্য চর্চার যে অভিজ্ঞতা হাজার বছর ধরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তারই একটি আধুনিক রূপান্তর মুক্তিযুদ্ধের অব্যাহতির পরেই ঘটে যায়। মুক্তিযুদ্ধোত্তর পর্বের বাংলাদেশের নাটকের রচনা, প্রয়োগ ও তাত্ত্বিক বিনির্মাণ বিশ্বনাটকের ধারায় বিশেষভাবে উল্লেখের দাবিদার। এই কালপর্বের নাট্যকার, অভিনেতা-অভিনেত্রী, নির্দেশক এবং তাত্ত্বিকগণ তাঁদের থিয়েটার অভিজ্ঞতার সঙ্গে ঐতিহ্য ও আধুনিক বিশ্বের থিয়েটার ভাবনার সমন্বয় ঘটিয়ে বাংলাদেশের নাটককে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তীকালের নাটক থেকে ভিন্নতর একটি স্থানে প্রতিষ্ঠা করলেন ইতিহাস, সময় ও কাল বিচারে যা আধুনিক।

বাংলাদেশের নাটকের আরও একটি ধারাকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এটিও সামগ্রিক অর্থে অর্জন। তা হলো সচেতনতা বৃদ্ধির নাটক, যা উন্নয়ন নাটক কিংবা ডেভেলপমেন্ট থিয়েটার। নাটকে সচেতনতা বৃদ্ধির কথাটি একালের নতুন আবিষ্কার নয়। আমরা দেখেছি ধ্রুপদী নাটক কিংবা যে কোন মহৎ নাটকেই মানবজীবনের শুভবুদ্ধির কিংবা শুভের উদ্বোধন ঘটে। ভালো-মন্দের দ্বন্দ্বে ভালো বিজয়ী হয়েছে সর্বকালে। এর পেছনে কাজ করে একটি ‘সিভিল কনসাসনেস’। এই ‘সিভিল কনসাসনেস’কে আলাদাভাবে দেখে আজকের বিশ্বে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নাটককে অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। এখন এই ধারার নাটকের উদ্ভাবকেরা নাটককে আর শুধু বিনোদনের মাধ্যম বিবেচনা করেন না। এখন সারা বিশ্বে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নাটকের প্রয়োগগত যে তাত্ত্বিক বিনির্মাণ ঘটেছে তা উন্নয়ন থিয়েটার নামে পরিচিত হয়েছে।

এখন বাংলাদেশে এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো নানা নামে যে থিয়েটার সংগঠন তৈরি করেছে তা কেবলি নাটককে প্রচারের মাধ্যমে রূপে গণ্য করছে। এটি নানা কারণে ব্যাপকতা পেয়েছে। তার একটি হলো থিয়েটার কর্মীকে পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠা দান। বাংলাদেশে এখন এনজিওভিত্তিক থিয়েটার সংগঠনের সংখ্যা অসংখ্য। সাধারণ জনগণকে নানা বিষয়ে সচেতন করার জন্য কিংবা কোনো বক্তব্য প্রচারের বাহন হিসেবে এখন উন্নয়ন থিয়েটার একটি নাট্য পরিভাষার মর্যাদা পেয়েছে। এখন সাইকোড্রামা সোসিওমেট্রিকস, ক্লিনিক্যাল থিয়েটার বিশেষ করে সামাজিক উন্নয়নের লক্ষে প্রতিষ্ঠিত এনজিও সংগঠনের ডেভেলপমেন্ট থিয়েটার নাটকের শিল্প বিবেচনাকে বাদ দিয়ে নাটককে যেভাবে বক্তব্য প্রচারের বাহন হিসেবে গ্রহণ করেছে ব্যাপকতার দিক থেকে তা অবশ্যই বাংলাদেশে নাটকের নতুন ধারারূপে চিহ্নিত। নতুন সময়ের প্রয়োজন ও অভিঘাতকে ধারণ করে এই সময়ের নাটক বিভিন্ন বিষয়াবলিকে সংঘবদ্ধ করেছে। এই ধারার নাট্যপ্রয়াসে দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশই প্রচারসর্বস্ব। তবে একথা বলা যায় যে এসকল নাটকের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি, বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন কিংবা নারীর অধিকার রক্ষায় এসকল সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে একইসঙ্গে রাজনৈতিক অর্থায়ন ও অভীপ্সায় গঠিত এনজিওগুলো নাটকের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকা-কেও উসকে দিয়েছে। এর নিরসন হওয়া দেশের স্বার্থেই জরুরি। এ প্রসঙ্গে এ কথাটিও বিবেচনায় আনা দরকার যে আধুনিকতার অন্যতম মাপকাঠি সেক্যুলারিজম এবং যুক্তিবাদকে ধরা হলে বাংলাদেশে এখনও এর পূর্ণতর প্রতিষ্ঠা ঘটে নি। যতোটুকু সম্ভব হয়েছে তার অধিকাংশ কৃতিত্বের দাবিদার এদেশের সংস্কৃতিকর্মীগণ বিশেষ করে থিয়েটার কর্মীরা। থিয়েটার কর্মীরা সংঘবদ্ধভাবে নাটকের মাধ্যমে ‘সেক্যুলারিজম’ এবং ‘সিভিল কনসাসনেস’ তৈরির চেষ্টায় ব্রতী রয়েছেন। থিয়েটারের এসকল কাজ আধুনিক সময় ও প্রয়োজনকে স্পর্শ করারই চেষ্টা মাত্র।

বাংলাদেশের নাটকের আধুনিক অভিযাত্রার অন্যতম নিয়ামক এদেশের গ্রুপ থিয়েটার সংগঠনগুলো। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটার সংগঠনগুলো দলীয় আদর্শ ও উদ্দেশ্য স্বতন্ত্র থেকেছে। এসকল নাট্যদলের কর্মীদের প্রকাশ্য কিংবা প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস রয়েছে। তাই তারা নাট্যচর্চার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকার ঘোষণা করে। দেশীয় ঐতিহ্য কিংবা শেকড় সংলগ্ন সংস্কৃতির প্রতি প্রবল টান থেকেই তারা নাট্যচর্চায় নিজেদের নিবেদিত করে। যদিও বর্তমানে মিডিয়া ও টেকনোলজির ব্যাপক প্রসারের কারণে গ্রুপ থিয়েটারের কমিটমেন্ট শিথিল হয়ে আসছে। এই পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশেই ঘটছে না, সমগ্র বিশ্বনাট্যচর্চার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটারগুলো নাটকের সামগ্রিক অগ্রগতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপাদান জনসংস্কৃতির সঙ্গে নাট্যকর্মী এবং সিভিল সোসাইটির দূরত্ব কমিয়ে এনেছে। এটি বাঙলা নাটকের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আমরা জানি যে আধুনিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি মানেই জনগণের সংস্কৃতিকে নিম্ন সংস্কৃতিরূপে গণ্য করে দূরে সরিয়ে রাখা। সাধারণ মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গে উচ্চশ্রেণির সংস্কৃতির বিভাজন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কালে ছিল। কিন্তু এই বিভাজনকে ১৯৭৬ সালে একটি টার্ম হিসেবে নিয়ে এলেন নৃবিজ্ঞানী এডোয়ার্ড টি. হল তাঁর বিয়ন্ড কালচার গ্রন্থে। আধুনিক কালে এসে সাধারণ মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিক মানুষের সংস্কৃতির তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন তৈরি হয়েছে। আর এভাবেই সমাজে ‘উচ্চ সংস্কৃতি’ ও ‘নিম্ন সংস্কৃতি’ এই শব্দবন্ধ চালু হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধোত্তর কালের নাট্যচর্চায় আধুনিক মানেই উচ্চ সংস্কৃতি এই ধারণাটির বর্জন ঘটেছে গ্রুপ থিয়েটার প্রচেষ্টায়। আধুনিক এবং আধুনিক শিল্পভাবনাকে ঐতিহ্যের সঙ্গে অঙ্গীকরণ করেই মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালের বাঙলা নাটকের তাত্ত্বিক বিনির্মাণ ঘটেছে। অর্থাৎ লোকনাটকের উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়ে আধুনিক নাট্যভাবনার ভিন্নতর উপস্থাপন ঘটেছে বাংলাদেশে নাট্যচর্চায়। এই নাট্যরীতি হাজার বছর ধরে চর্চিত বর্ণনাত্মক বাংলা নাট্যাভিনয় রীতি। এই রীতিটিই আমাদের নাটককে স্বতন্ত্র ও মহিমান্বিত করেছে বিশ্বনাটকের ধারায়। এখন অনেকেই উপেক্ষা করেন কিন্তু একটা সময় আসবে যখন বাংলাদেশ গর্ব করবে তার বর্ণনাত্মক নাট্যরীতির পরিচয় দিয়ে। সেদিন আর বেশি দূরে নয়। কারণ পৃথিবীর বহু দেশেই তার জাতীয় নাট্যরীতি আছে। যেমন জাপানের নো কাবুকি, চিনের চাইনিজ অপেরা, পঞ্চাঙ্ক রীতির ইউরোপীয় নাটক, গ্রিক নাটক বললেই রীতিটি চেনা যায়। কিন্তু বাঙালির জাতীয় নাট্যরীতি কী প্রশ্ন করলে কোন উত্তরে নেই। তবে আমাদের জাতীয় নাট্য আঙ্গিক কোনটা? আমি স্পষ্টভাবেই বলতে চাই তা হলো বাংলাদেশের বর্ণনাত্মক নাট্যরীতি যা হাজার বছর ধরে চর্চিত হয়ে এসেছে এই ভূখন্ডে। স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে বর্ণনাত্মক বাংলা নাট্যরীতিকে জাতীয় নাট্য আঙ্গিক ঘোষণা করার এখনই প্রকৃষ্ট সময়। তাহলে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্য নমুনাগুলো আমাদের জাতিসত্তাকে স্বতন্ত্র মহিমায় উদ্ভাসিত করবে বিশ্বসংস্কৃতির বৃহত্তর পরিমন্ডলে।

রবীন্দ্রনাথ চেষ্টা করেছিলেন বাংলার পাঁচালি, পালা, যাত্রা সহ ঐতিহ্যবাহী নাটকের শৈলীর আধুনিকীকরণ ঘটাতে। তাঁর নাটকে তাই (দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে) ইউরোপীয় অংক বিভাজন রীতি নেই। তিনি চেষ্টা করেছিলেন বর্ণনাত্মক পালা পাচালির আলোকে বাংলা নাটকের আঙ্গিক নির্মাণ করতে। কিন্তু সেই ধারাটি পরবর্তীকালে ব্যাপকভাবে চর্চিত হয় নি। বাংলার নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক বিকাশের পথে কালে কালে বাধা এসেছে বারবার। বারবারই উচ্চ সংস্কৃতির অভিজাত মানুষেরা এই রীতিটাকে দমিয়ে রেখেছে নিম্নশ্রেণির মানুষের সংস্কৃতি বলে। আসলে তারা এক বিশাল বঙ্গীয় জনপদের মানুষদের নিম্নশ্রেণির বলে উপেক্ষা করেছে। আর এজন্যই আচার্য ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্র গ্রন্থে সেই সময়ে প্রচলিত ও জনপ্রিয় বঙ্গীয় জনপদের মানুষদের নিম্নশ্রেণির বলে উপেক্ষা করেছে। আর এজন্যই আচার্য ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্র গ্রন্থে সেই সময়ে প্রচলিত ও জনপ্রিয় বঙ্গীয় নাট্যরীতির নামটিই উল্লেখ করলেন তার কোন ব্যাখ্যা প্রদান করলেন না।

এই ভূখন্ড বারবারই পরাধীন থেকেছে। নিজেদের ভাষায় শিল্পসাহিত্য চর্চা করারও স্বাধীনতা এই জনগোষ্ঠী পায় নি। চর্যাপদের কবিরা পাহাড়ে অরণ্যে লুকিয়ে বাঙলা ভাষায় কবিতা গান রচনার চেষ্টা করেছেন। চর্যাপদের একটি কবিতায় একজন নৃত্যশিল্পীর উল্লেখ রয়েছে। স্পষ্টতই সে অনার্য এবং নিম্নশ্রেণির। কিন্তু নৃত্যকলায় অসাধারণ পারদর্শী এই শিল্পী নিজের শরীরের ভর শরীরে রেখে পদ্মফুলের পাপড়ির উপর নাচতে পারেন বলে চর্যার কবি উল্লেখ করেছেন। এই পারদর্শিতা যে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর উন্নত সংস্কৃতি না থাকলে সম্ভব নয় তা স্পষ্ট। কিন্তু তাও অভিজাত সংস্কৃতির কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় নি। এভাবে উপেক্ষিত হতে হতে এক সময় অবলুপ্ত হয়েছে বাঙলার নিজস্ব নাট্যরীতি ও সংস্কৃতি। অথচ আর্যরাই অনার্য শিবকে নাট্যদেবতারূপে গ্রহণ করেছিল। আর্যীয়করণের পূর্ব থেকেই বঙ্গীয় ভূখন্ডে নাট্যকলার যে বিকাশ ঘটেছে তারই প্রমাণ ভরতনাট্যশাস্ত্র গ্রন্থে রয়েছে। এসকল নাট্যের বিকাশ ও পরিপুষ্টি ঘটেছে গণসংস্কৃতিকে গ্রহণ করে। এইভাবে যে নাট্যরীতি সমগ্র দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে তাই জাতীয় নাট্য আঙ্গিক এবং তা নিঃসন্দেহে বর্ণনাত্মক নাট্যরীতি। এই নাট্যের শিল্পনিষ্পত্তির জন্য ইউরোপীয় শিল্পরীতি কিংবা অ্যারিস্টটলের তত্ত্বের কাছে হাত পাতার প্রয়োজন নেই।

হাজার বছর ধরে বাঙালির যেমন নিজস্ব নাট্যরীতি ছিল তেমনি ছিল নিজস্ব নন্দনশাস্ত্র। সমগ্র ইউরোপ যেমন পোয়েট্রিকস অনুসরণে শিল্পতত্ত্ব বিচারে ব্রতী হয়েছে তেমনি সমগ্র বঙ্গীয় জনপদের শিল্প নন্দনশাস্ত্র হলো চৈতন্য শিষ্য শ্রীরূপগোস্বামী প্রণীত উজ্জ্বল নীলমনি গ্রন্থ। এই গ্রন্থটি একালে ব্যাপকভাবে পঠিত হওয়া প্রয়োজন। এই গ্রন্থদৃষ্টে এমত ধারণায় উপনীত হওয়া যায় যে সংস্কৃত কাব্য কিংবা নাট্যতত্ত্বের ভাবনা থেকে একেবারেই স্বতন্ত্র শিল্পতত্ত্ব ছিল বাংলাদেশে। জয়দেবের গীতগোবিন্দ পরিবেশনায় এই শিল্পরীতির ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

এই দীর্ঘ অবতারণার কারণ হলো, আমি বলতে চেয়েছি এই বর্ণনাত্মক বাংলা নাট্যরীতি আমাদের জাতীয় নাট্য আঙ্গিক। এর সঙ্গে জাতীয় সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠ অন্বয় রয়েছে। নিম্ন কিংবা লোকসংস্কৃতি বলে যা উপেক্ষিত ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায় তা-ই হয়ে উঠেছে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি। আর তাই বাংলাদেশে নিম্নসংস্কৃতির ‘ফোক’ শব্দটি ঔপনিবেশিক ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পর নাট্যকর্মীদের হাতে। লোক ঐতিহ্যের উপাদান-উপকরণ বাঙলা নাটকের বিষয়ও আঙ্গিক নির্মাণ রীতিটাই বদলে দেয়। এই কালপর্বে এসে নাট্য বিষয়ে লোকগল্পের উপাদান ও সমকালীন বাস্তবতাকে অঙ্গীকরণ করেই নাট্যরচনার নবধারা তৈরি হলো। নাটকের বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে আঙ্গিকেও বদল ঘটল। এই রচনারীতির প্রভাব পড়ল নাট্য মঞ্চায়নে। এর ফলে দীর্ঘকালের প্রসেনিয়াম ঘেরাটোপ থেকে বাংলাদেশের নাটকের মুক্তি ঘটল। মৌলিক নাট্য রচনায় সংলাপের গড়ন পাল্টে যেতে থাকল। নাট্য দর্শক এবং অভিনেতার যে সংযোগ হাজার বছর ধরে চালু ছিল আসরকেন্দ্রিক পরিবেশনায় তারই একটি নতুনতর নির্মাণ ঘটে বাংলাদেশের নাটকে। সংস্কৃতিকে বিভাজনের ভেদবুদ্ধিজাত উচু-নিচু সংস্কৃতির প্রায় বিলোপ ঘটেছে বাংলাদেশের নাট্যচর্চায়। আর এই সংস্কৃতির বিভাজন রীতি থেকে বেরিয়ে এসেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা নির্মাণ করেছিলেন সংলাপ, বর্ণনা ও সঙ্গীত এই ত্রয়ীর সম্মিলনে বর্ণনাত্মক বাঙলা নাট্যরীতি। দীর্ঘ আড়াই হাজার বছর ধরে সংলাপ-প্রতিসংলাপের মধ্যদিয়ে যে ইউরোপীয় নাট্যরীতির বিকাশ ঘটেছে তার থেকে একেবারেই স্বতন্ত্র উপস্থাপনা বর্ণনাত্মক বাংলা নাট্যরীতি। ঔপনিবেশিক শিল্পতত্ত্বের আলোকে যারা এই নাট্যরীতিকে নাকচ করে দিতে চান তাঁদের জন্য করুণা বোধ করা যায়। এই সঙ্গীত, সংলাপ ও বর্ণনার ত্রয়ী শুধু সংলাপ-প্রতিসংলাপের ইউরোপীয় রীতি থেকেই নয়, সংস্কৃত শিল্পতত্ত্ব থেকেও বাংলাদেশের এই নাট্যরীতি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হয়েছে।

অ্যারিস্টটলের নির্দেশিত শিল্পরীতি অনুযায়ী এদেশের নাটক ঘটনার অনুকরণ করে না, জীবনের ব্যাখ্যা করে। বাঙালির নিজস্ব শিল্প নন্দনভাবনার আলোকে বাংলাদেশের নাট্য আঙ্গিকের এই নবতর বিনির্মাণ সম্ভব হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পর। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন তার নাটক, বিশেষ করে নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক বর্ণনাত্মক নাট্যরীতির পুনঃনির্মাণ। বাংলাদেশের নাট্যকারগণ তাঁদের নাটকে সমগ্র দেশ এবং মানুষের আখ্যানকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার অনুকরণ না করে ‘লোকবৃত্তির’ অনুকরণ করেছেন কিন্তু তা সংস্কৃত শিল্পতত্ত্বের নিগড়ে আবদ্ধ থেকে নয়। বর্ণনা, সঙ্গীত ও সংলাপ এই ত্রয়ীর সম্মিলনে জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের রূপকার সেলিম আল দীনের নাটক একটি জনপদের আখ্যান হয়ে উঠেছে। এ আখ্যান রচিত হয়েছে এদেশের ভূগোলে। এসকল আখ্যানের মৌল প্রবণতা ছিল অসাম্প্রদায়িক এক শিল্প হিসেবে| অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের মূল চেতনায় ফিরে আসার জন্য শিল্প সংস্কৃতি, বিশেষ করে নাটক এবং নাট্যকর্মীগণই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

  • হিতাংশু ভূষণ কর: সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সিলেট জেলা সংসদ
  • এ বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত