আজ শুক্রবার, , ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ ইং

আব্দুল করিম কিম

১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ১৪:৩৫

বঙ্গবন্ধুর অবমাননা কেন?

লন্ডনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে হামলা করেছেন বিএনপি সমর্থক প্রবাসীরা। স্বদেশে আন্দোলন ও মতপ্রকাশে বাঁধা দেয়া হলে নিজ দেশের দূতাবাস ঘেরাও করার নজির আছে পৃথিবীতে। দেশে মিছিল-মিটিং করতে বাধা দেয়া হয়। তাই বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা অবাধ নির্বাচনের দাবিতে, বিরোধী নেতাকর্মীদের নামে অহেতুক হয়রানি, গুম, সন্ত্রাস, সুন্দরবন বিনাশী রামপাল প্রকল্প, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি বা ব্যাংক লোপাটের প্রতিবাদেও দূতাবাসের সামনে কর্মসূচী পালন করতে পারে।

এমন প্রতিবাদ কর্মসূচী প্রশংসনীয়। এতে দেশপ্রেম আছে, নৈতিকতা আছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার নামে তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর দায়ের করা মামলার রায়কে কেন্দ্র করে লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসে হামলা করার অর্থ কি? শুধু দূতাবাসে হামলা নয়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ছবি চরম ধৃষ্টতাপূর্ণভাবে অবমাননা করা হয়েছে। যা নজিরবিহীন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্রেফ একজন রাজনৈতিক নেতা নন, কেবল সাবেক রাষ্ট্রপতি নন, সাংবিধানিকভাবেই তিনি জাতির পিতা, ঐতিহাসিক ভাবেই তিনি রাষ্ট্রের স্থপতি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিক দাবি করবেন আর বঙ্গবন্ধুর অবদান অস্বীকার করবেন তা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে সমালোচনা করুন, বাকশাল গঠন নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করুন কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতিকে নিয়ে ভিন্ন চিন্তার অবকাশ নেই। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট নির্মম হত্যাকাণ্ডে সপরিবারে নিহত বঙ্গবন্ধুর খালেদা জিয়ার নামে দায়ের করা দুর্নীতি মামলা ও মামলার রায়ের সাথে সংশ্লিষ্টতা কি?  

মামলাটি দায়ের করা হয়েছে মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারের আমলে। ঐ আমলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর চেয়ারম্যান ছিলেন জেনারেল হাসান মাশহুদ চৌধুরী। এই হাসান মাশহুদ চৌধুরীকে খালেদা জিয়া দ্বিতীয় দফা প্রধানমন্ত্রী হয়ে সেনাপ্রধান হিসাবে নিয়োগ দেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাসান মাশহুদ চৌধুরী ২০০২ সালের ১৬ জুন থেকে ২০০৫ সালের ১৫ জুন পর্যন্ত বিএনপি সরকারের আমলে বিশ্বস্ততার সহিত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। উনার 'সততা' নিয়ে বিএনপিপন্থীরা নানান মিথ প্রকাশ করেছে। সেই 'সৎ' ও 'নির্ভীক' দুদক চেয়ারম্যান শুধু খালেদা জিয়ার নামেই নয়, শেখ হাসিনার নামেও দুর্নীতির মামলা করেছিলেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে জেনারেল হাসান মাশহুদ চৌধুরী সারা দেশে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান শুরু করেন। দায়িত্ব গ্রহণ করেই একের পর এক মামলা দায়ের শুরু হয়। দুর্নীতির নানান কাহিনী জনসমক্ষে উন্মোচিত হতে থাকে। এসব কাহিনী পূর্বে শোনা হয়নি বা অজানা ছিল এমন নয়। হাওয়া ভবন থেকে শুরু করে, প্রধান দুই দলের নেতা-নেত্রীদের চাঁদাবাজি নিয়ে সর্বমহলেই ফিসফাস ছিল। যা সে সময় সাক্ষী সাবুদ সহ দুদক উন্মোচন করতে থাকে। একের পর এক মামলা দায়ের চলতে থাকে ।  

তত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর সময়কালে সেইসব মামলার কার্যক্রম চলতে থাকে। এর মধ্যেই প্রতিশ্রুত নির্বাচন আসে। আর সে নির্বাচনে বিপুল আসনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় বসেন শেখ হাসিনা। যদিও প্রজাতন্ত্রে ক্ষমতায় বসার কথা নয়, দেশ পরিচালনা করার কথা। কিন্তু আমাদের প্রজাতন্ত্রে দেশ পরিচালনার অনুমোদন পাওয়া মানে রাজতন্ত্রের মত সিংহাসনে আরোহণ। তাই সিংহাসনে বসা শেখ হাসিনা দুদকের মামলা থেকে অটোমেটিক অব্যাহতি লাভ করেন। সিংহাসনে শেখ হাসিনা না বসে, বেগম খালেদা জিয়া বসলেও একই ঘটনা দেখতে পেতাম। তখন খালেদা জিয়ার মামলা খারিজ হয়ে যেত, আর শেখ হাসিনার মামলা দ্রুত শেষ হয়ে যেত। এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা। এটাই সত্য। তাই এই মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা লাভ অচিন্তনীয় বিষয় নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে একজন প্রধানমন্ত্রীর জন্য দুই/চার কোটি টাকা কোন টাকাই না। সাজা দেয়ার জন্য ভালোভাবে চালুনি দিলে রাষ্ট্রের অনেক বড় অংকের টাকা বা সম্পদ বিনষ্টের জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত ছিল সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে। কিন্তু মোটা দাগের কোন অপরাধের অভিযোগ পর্যন্ত উত্থাপন করা সম্ভব হয়নি। বাংলা ভাষায় প্রচলিত একটি কথা আছে 'পচা শামুকে পা কাটে'। খালেদা জিয়ার পচা শামুকেই পা কাটলো। সামান্য টাকার জন্য আজ তিনি সাজাপ্রাপ্ত। এর চেয়ে বেশী টাকা বর্তমান সরকারের থানা পর্যায়ের অনেক নেতা তহবিল তসরুফ করছেন। সে তুলনায় এই টাকা কোন টাকাই না। খালেদা জিয়ার এই সাজার মাধ্যমে একটা আশাবাদ জাগে। অন্যায় কখনোই লুকানো যায় না। আমরা ভুলে যাই 'crime never pays'।

খালেদা জিয়ার এই দণ্ডাদেশে বিএনপি সমর্থক নেতাকর্মীরা সহজে মানতে পারছেন না। তাঁদের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছে। খালেদা জিয়া রায় প্রদানের পূর্বেই দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলীয় উদ্যোগে হঠকারী আন্দোলনে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। দল তা অনুসরণ করছে। কিন্তু কিছু ব্যক্তি হঠকারী কার্যকলাপ করার চেষ্টা করেছে। দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত প্রতিরোধে তেমন কিছু করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসে হামলা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি অবমাননা করেছে বিএনপি'র একটি অংশ। যার দায়ভার লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়াকে নিতে হবে। লন্ডনের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তিনি বঙ্গবন্ধুকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ইতোপূর্বে বক্তব্য দিয়েছেন। যা তাঁর কর্মীদের মধ্যে সংক্রামিত হয়েছে।

খালেদা জিয়ার দণ্ডাদেশের রায় প্রত্যাখ্যান করে যদি বিএনপি মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের বা হাসান মশহুদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতো তবে তা যুক্তিসংগত ছিল । এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে কুশপুত্তলিকা দু'চারটা পুড়িয়ে দিলেও মেনে নেয়া যেত । কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত