আজ শুক্রবার, , ২১ জুলাই ২০১৭ ইং

‘ইসলাম বিতর্ক’ ছাপিয়ে ফেসবুকে ‘জাফর ইকবাল বিতর্ক’

 প্রকাশিত: ২০১৬-০২-১৯ ২০:৪৭:৪৩

 আপডেট: ২০১৬-০২-১৯ ২১:১০:৪২

সিলেটটুডে ডেস্ক:

ব-দ্বীপ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘ইসলাম বিতর্ক’ বইয়ের মাধ্যমে 'ধর্মানুভূতি আহত' হয়েছে এমন অভিযোগে প্রকাশনা সংস্থাটির স্টল পুলিশ কর্তৃক বন্ধ করে দেওয়া, প্রকাশক-অনুবাদক সহ তিন জনকে গ্রেপ্তারের পরবর্তী সময়ে বইটিকে  ‘অশ্লীল’ আখ্যা দিয়ে বইটি পড়তে নিষেধ করায় অধ্যাপক ও লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক জুড়ে।

'ইসলাম বিতর্ক' বইটি ব-দ্বীপ প্রকাশন থেকে প্রথম প্রকাশ হয় নভেম্বর ২০১০।

১৫ ফেব্রুয়ারি বইটি স্টল বন্ধ করে দেওয়ার পর আলোচনা-সমালোচনা বইকেন্দ্রিক থাকলেও ১৭ ফেব্রুয়ারি মুহম্মদ জাফর ইকবালের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে 'ইসলাম বিতর্ক' বই নিয়ে বিতর্ক মূলত চলে যায় জাফর ইকবালের মন্তব্যকে ঘিরে। মন্তব্যে জাফর ইকবাল স্বীকার করেছেন তিনি নিজে বইটি পড়েন নি, তবে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান তাঁকে বইয়ের কয়েক লাইন পড়ে শুনিয়েছেন।

তুমুল জনপ্রিয় এ লেখকের মন্তব্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা বইছে ফেসবুক জুড়ে। অনেকের কাছে জাফর ইকবালের এধরনের মন্তব্য আশাহত হওয়ার মত ঘটনা বলে মনে হয়েছে, আবার অনেকেই সেখান থেকেও খুঁজছেন যৌক্তিকতার রসদ।

সাংবাদিক শওগাত আলী সাগর লিখেছেন,

জাফর ইকবালের কাছে যদি ‘ইসলামের বিতর্ক’ নামের বইটা অশ্লীল মনে হয়, তা নিয়ে আমার আপনার আপত্তি করার কিছু নাই। তিনি যদি এই বইটি না পড়ার জন্য কাউকে অনুরোধ জানান- সেটাও তিনি করতে পারেন। সেটা তার অধিকারের মধ্যে পড়ে। তাঁর অনুরোধ শোনা বা না শোনা আমার আপনার এখতিয়ার এবং অধিকার। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের জন্য তাঁর উপর হামলে পড়া- তাঁর মত প্রকাশের অধিকারে হস্তক্ষেপ।এই হস্তক্ষেপ করার অধিকার আমার আপনার কারো নাই।
আমার পছন্দ হইলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, আমার বিপক্ষে গেলে হামলে পড়া –এই প্রবণতা বিপদজনক।

অসীম চক্রবর্তী লিখেছেন,

একজন মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ভুল করে। ডক্টর ইকবাল একজন মানুষ এবং তিনিও ভুল করতে পারেন। আবার ভুল শুধরেও নিতে পারেন। নিশ্চয়ই ডক্টর ইকবাল তাঁর ভুল শুধরে নেবেন।

এনামুল হক জাফর ইকবাল নিষেধ করেছেন বলে বইয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মানোর কথা জানিয়ে লিখেন,

"ইসলাম বিতর্ক" নামটি শুনেই বুঝতে পেরেছিলাম এর বিষয়বস্তু কেমন হবে। ইসলামের বিতর্কিত বিষয়গুলো যতভাবে জানা সম্ভব গত এক বছরে জেনেছি, নতুন কিছু জানার নেই। তাই পড়ার তেমন একটা আগ্রহ অনুভব করিনি। কিন্তু শ্রদ্ধেয় ড. জাফর ইকবাল স্যারের মন্তব্যে আগ্রহটা বেড়ে গেলো। স্যার বলেছেন বইটির কয়েকটা লাইন শুনে তাঁর বমি চলে আসার উপক্রম হয়েছে এবং এই অশ্লীল বইটি যেন কেউ না পড়ে সেরকম উপদেশ দিয়েছেন।

পিডিএফটা হাতে পেয়ে নগদে পড়ে ফেললাম। ছোট এই বইটার প্রতিটি লেখায় ঐতিহাসিক সত্যতা ছাড়া ব্যক্তিগত মতামত খুব কমই প্রাধাণ্য পেয়েছে। আমি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও অশ্লীল কিছু পাইনি। যা পেয়েছি তা হলো নবি মুহাম্মদের দ্বারা ঘটিত কিছু ঘটনার বর্ণনা যা হাদিস, কোরান আর সীরাতের উদ্ধৃতি। এছাড়া বিভিন্ন ঐতিহাসিকের উদ্ধৃতিতে মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তারে হত্যাযজ্ঞ, দাসকরণ, খোঁজাকরণ, ধর্মান্তরিতকরণের কিছু বর্ণনা।

কিন্তু অশ্লীলতা কোথায়? একটা ঐতিহাসিক সত্যের নির্মোহ বর্ণনা বিশ্লেষণ যদি অশ্লীলতা হয় তবে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা বইপত্রগুলোও তো অশ্লীল কেননা এতে পাক বাহিনী কর্তৃক বাঙ্গালী নারী ধর্ষণ, স্তন কেটে ফেলা, যৌনাঙ্গে রাইফেল ঢুকানোর কথা লেখা আছে।

বইটি সম্পর্কে স্যারের এই অদ্ভুত মন্তব্যটা আমি এখনো গিলতে পারসিনা। বইটার পিডিএফ লিঙ্ক শেয়ার করলাম, কেউ অশ্লীলতা খোঁজে পেলে জানিয়েন।

কবি চৈতী আহমেদ ফেসবুকে লিখেন,

আমি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হইলে অশ্লীল বইয়ের দোকানটা খুলে দিতাম।

ফেসবুকে জোবায়েন সন্ধি আক্ষেপ করে লিখেন,

গ্রেফতার না হয়ে শামসুজ্জোহা যদি চাপাতিতে খুন হতেন, তাহলে জাফর ইকবাল বলতেন- 'তাঁর মতো ভাল মানুষ এই সমাজে দরকার' যেমনটা অনন্তর সময় বলেছিলেন।

তরুণ চক্রবর্তী সাহিত্যিক জাফর ইকবালের প্রতি আহ্বান জানিয়ে লিখেন,

জাফর ইকবাল সাহেব, ডাবল স্টাণ্ডার্ড বাদ দিন দয়া ক'রে।
'ইসলাম বিতর্ক' বইটি প্রকাশ করার অপরাধে ব-দ্বীপ প্রকাশনী বন্ধ করার পক্ষে মত দিয়ে প্রফেসর জাফর ইকবাল বলেছেন, 'এ বই যেন কেউ না পড়েন'। কেন জাফর ইকবাল সাহেব এ বই কেউ পড়বে না কেন? এ বইয়ে এমন একটা বাক্য দেখাতে পারবেন যে বাক্যটা অসত্য বা ইতিহাস-অসমর্থিত? এমন একটা বাক্য দেখাতে পারবেন যেটা অশ্লীল? তাহলে এটা কেউ পড়বে না কেন?

ধর্মের অসারতা, অযৌক্তিকতা এবং ধর্ম প্রচারকের ছল-চাতুরি মানুষ জেনে যাক এটা ধর্ম ব্যবসায়ীরা চাইবে না কারণ তাহলে তাদের ধর্ম ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে; কিন্তু আপনি এটা চান না কেন? অন্য পাঁচ জন ব্লগারের মতো আপনাকেও ওরা যাতে মেরে না ফেলে সেই জন্য এ সব বিবেক-পরিপন্থী কথা বলছেন? আপনার কি ধারণা আপনাকে ওরা রেহাই দিবে? আপনার ডাবল স্টাণ্ডার্ড ওরা বোঝে না?

তার চেয়ে আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদের মতো নিজের অবস্থান পরিষ্কার করুন এবং বাংলাদেশকে একটি ধর্ম-নিরেপেক্ষ উন্নত আধুনিক দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করুন। যে কোন নাগরিকের যে কোন মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে সে দেশকে একটা সভ্য দেশ বলা যায় না সেটা আপনার চেয়ে আর কে ভাল জানে, জাফর ইকবাল সাহেব? ডাবল স্টাণ্ডার্ড বাদ দিন দয়া ক'রে।

রাহাত মুস্তাফিজ  লিখেন,

এই মর্মে সব্বাইকে জানানো যাচ্ছে যে, জনাব শ্রদ্ধেয় জাফর স্যারের সাথে আমার বা আমার চৌদ্দগুষ্টির কারো কোনো সেলফি নেই। তবে অনেকবছর আগে উনার একটি অটোগ্রাফ সংগ্রহ করেছিলাম। ওই অটোগ্রাফটি আমার একমাত্র দু:খ। এছাড়া আমার আর কোনো দু:খ নেই এই রঙ্গেভরা বঙ্গমঞ্চে।

রাজেশ পাল ফেসবুকে লিখেছেন,

মাত্র একটি কথার জন্য যেভাবে জাফর ইকবাল স্যারের উপর স্ট্যাটাস বারি বর্ষণ করে চলেছেন, তাতে সত্যিই অবাক হতে হয়। স্যার কোন ধর্মগুরু বা পীর সাহেব নন। উনার সব কথা আপনার বা আমার ভালো নাই লাগতে পারে। তাই বলে একটি ঘটনার জন্য একটি মানুষের সারা জীবনের স্ট্যান্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যৌক্তিকতা কতটুকু?

হযরত বিনয় ভদ্র লিখেছেন,

কী পড়বেন, কী পড়বেন না... শ্লীল- অশ্লীল কী? জাফর ইকবালের নতুন বই আসন্ন।

গত ১৭ তারিখে বই মেলায় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ব-দ্বীপের ‘ইসলাম বিতর্ক’ বই নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। বইটি নিয়ে তাঁর মন্তব্য দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। গণমাধ্যমকে জাফর ইকবাল বলেন,‘ যে বইটির কারণে স্টলটি বন্ধ করা হয়েছে, সেটির কয়েকটি লাইন আমাদের বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পড়ে শুনিয়েছেন। আমি কয়েক লাইন শোনার পর আর সহ্য করতে পারিনি। এতো অশ্লীল আর অশালীন লেখা। এই স্টলটিকে আর অন্য দশটি সাধারণ স্টলের সঙ্গে তুলনা করলে চলবে না।

তিনি বলেন, আমি মনে করে লেখালেখির সময় কিছুটা সতর্ক থাকতে হবে। যাতে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না আসে। আর যে বইটির বিষয়ে কথা হচ্ছে, আমার অনুরোধ কেউ যেন এই বইটি না পড়ে’।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে ‘ইসলাম বিতর্ক’ বই প্রথম প্রকাশ হয়েছিল। গত ৫ বছরে এবইয়ের খবর জানত না অনেকেই। কিন্তু এবারই প্রথম আলোচনায় আসে  বিএনপি-জামায়াতপন্থী আইনজীবী তুহিন মালিক, জামায়াত-শিবিরের ফেসবুক পেজ 'বাঁশেরকেল্লা', ফেসবুকে নয়ন চ্যাটার্জি নামক ইসলামধর্মভিত্তিক উগ্রবাদী আইডি এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মাধ্যমে। এবং দাবির মুখে একুশে গ্রন্থমেলার 'ব-দ্বীপ প্রকাশন'-এর স্টল বন্ধ করে দেয় পুলিশ।

তাদের দাবি ব-দ্বীপ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘ইসলাম ও বিতর্ক’ নামক বইয়ে ইসলাম ধর্মের নবী মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটাক্ষ করা হয়েছে। সোমবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) শাহবাগ থানা পুলিশ ইসলাম ধর্মের অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে অমর একুশে গ্রন্থমেলার ব-দ্বীপ প্রকাশনের স্টলটি বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি ওই প্রকাশনীর বেশ কয়েকটি বইও জব্দ করে এবং অনুবাদক-প্রকাশককে গ্রেপ্তার করে।

এর আগে গত বছর (২০১৫) ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের হুমকির মুখে ইরানী লেখক আলী দস্তির 'নবী মুহাম্মদের ২৩ বছর' বইটি প্রকাশের কারণে রোদেলা প্রকাশনীর স্টল বন্ধ করে দিয়েছিল বাংলা একাডেমি। তখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান জানিয়েছিলেন তারা অভিযোগের ভিত্তিতে স্টল বন্ধ করেছেন, বই পড়েন নি।

আপনার মন্তব্য