আজ সোমবার, , ২৩ অক্টোবর ২০১৭ ইং

ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন

১১ আগস্ট, ২০১৭ ২১:০৫

জয় বাবা শাহজালাল...

প্রাচ্যের অন্যতম জ্যোতির্ময় পুরুষ হিসাবে ইতিহাসখ্যাত হযরত শাহজালাল (র:) । পরিব্রাজক ও সংস্কারক হিসাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাঁর বঙ্গদেশে আগমন ঘটেছিল। তুরস্ক বা ইয়েমেনে জন্ম হয়েছিল এই অতিমানবের।

হযরত শাহজালাল (র:)-এর জন্ম, মৃত্যু ও বঙ্গদেশে তাঁর আগমন নিয়ে বিভক্ত ইতিহাসবিদরা। গবেষণা করে দূর ইতিহাসের এসব ঘটনাপঞ্জির যোগসূত্র স্থাপনে হিমশিম খেতে হচ্ছে এখনো। এ বিষয়ে যারা গবেষণা করছেন তাঁদের অধিকাংশের মতে হযরত শাহজালাল (র:)-এর প্রকৃত নাম ছিল মাখদুম জালাল আদ-দীন বিন মোহাম্মদ। তাঁর পিতা পারস্যের বিখ্যাত কবি রুমীর সমগোত্রীয় ছিলেন। শৈশবেই পিতা-মাতাকে হারিয়ে মাতুলালয়েই শাহজালাল প্রতিপালিত হয়েছেন। পবিত্র মক্কা নগরীতেই মাতুল সৈয়দ আহমদ কবির (রহঃ)-এর থেকেই ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। তিনি আধ্যাত্মিক সাধনার দীক্ষা মাতুলের থেকেই গ্রহণ করে চরম উৎকর্ষতা অর্জন করেন।

জনশ্রুতিতে ভরপুর হযরত শাহজালাল (র:)-এর বঙ্গদেশ যাত্রা এবং সিলেট বিজয়। বলা হয়ে থাকে, পূর্বদিকে যাত্রার প্রাক্কালে স্বীয় ধর্মগুরু ও মাতুল সৈয়দ আহমদ কবির (রহঃ) তাঁকে একমুষ্টি মাটি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যে মাটির সাথে সঙ্গে রাখা মাটির মিল পাবেন সেখানেই যেন আস্তানা করেন হজরত শাহজালাল (রহঃ)।

সুরমা নদী পেরিয়ে শ্রীভূমি সিলেটের মাটির সাথে সঙ্গে থাকা মাটির মিল খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর সিলেট আগমন ঘটেছিল বলে মনে করা হয়।

অত্যাচারী রাজা গৌড়গোবিন্দকে পরাজিত করে সিলেট জয় করেছিলেন হযরত শাহজালাল (রহঃ)। শিশুপুত্রের নামকরণ অনুষ্ঠানে গো-হত্যা করেছিলেন রাজা গৌড়গোবিন্দের মুসলিম প্রজা শেখ বোরহানউদ্দিন। গো-হত্যার কারণে নৃশংস সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের শিকার হতে হয় শেখ বোরহানউদ্দিনকে। রাজার নির্দেশে নবজাতক সেই শিশুকে হত্যা ও বোরহানদ্দিনের দুই হাত কেটে নেয়া হয়। এ ঘটনার সংবাদ দিল্লী সালতানাতে পৌঁছায়। অত্যাচার ও নিপীড়নের প্রতিকার নিশ্চিত করতে সঙ্গি সাথিদের নিয়ে সিলেট অভিযাত্রায় এসেছিলেন হযরত শাহজালাল (রহ)। অত্যাচারী রাজার নির্দেশে সুরমা নদীর সকল নৌযান বন্ধ করে দেয়া হয় । উদ্দেশ্য ছিল শাহজালাল ও তাঁর সঙ্গি সাথীদের সিলেট নগরে প্রবেশে বিগ্ন তৈরি করা। কিন্তু আধ্যাত্মিক সাধক হযরত শাহজালাল জায়নামাজ বিছিয়ে সঙ্গি সাথীদের নিয়ে সুরমা নদী পাড়ি দেন বলে কথিত আছে।

অত্যাচারী রাজার পরাজয়ে বিজয়ী শাহজালালকে নিপীড়িত হাতেগোনা কয়েক পরিবার মুসলমানের পাশাপাশি দলিত-নিগৃহীত অন্য প্রজারাও স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে স্বাগত জানায়। আর এভাবেই পতন ঘটে জনতার ঘাড়ে চেপে বসা নিষ্ঠুর গৌড়গোবিন্দ রাজের। জনশ্রুতি, লোক কাহিনী এবং জন বিশ্বাস নির্ভর হযরত শাহজালাল (রহ)-এর সিলেট আগমন বিষয়ক কাহিনীগুলো । জনবিশ্বাস ও জনশ্রুতির সাথে বাস্তবতার যোগসূত্র আজও খুঁজে পান ভক্তরা।

সিলেটে গৌড় গোবিন্দের সেনাপতি মনারায়ের টিলা, নিপীড়িত বোরহানউদ্দিন ও শিশুপুত্রের সমাধি, চাষনী পীরের মাজার, পেঁচাগড় দুর্গ, জালালী কবুতর, গজার মাছ, সাতশত বছর ধরে একি ভাবে প্রবহমান ঝর্না বিভিন্ন জনশ্রুতিকে বেগবান করে।

ইতিহাসের মধ্যযুগীয় সমাজ বাস্তবতায় সিলেট অঞ্চলে হযরত শাহজালাল-এর আগমন ঘটেছিল। পুরো অঞ্চল জুড়ে অভিজাত শ্রেণীর নিপীড়ন ও চাপিয়ে দেয়া রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে সংস্কারের অনুকূল বাতাস বইতে শুরু করে। হযরত শাহজালাল (রহ)-এর সঙ্গি সাথীরা ছড়িয়ে পরেন পুরো অঞ্চল জুড়ে। লোকজন তখন ব্যাপকভাবে শাহজালাল ও তদীয় সঙ্গীদের মুখে সাম্যের বাণী শুনে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে ।

শত শত বছরের সীমানা পেরিয়ে হযরত শাহজালাল (রহ) এবং তাঁর সাথীদের পুণ্য পদস্পর্শের ছাপ এখনো বিরাজমান পুরো সিলেট অঞ্চল জুড়ে । কোটি মানুষের হৃদয়ে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় পুণ্যাত্মার ভাবমূর্তি নিয়ে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে ভক্তরা জুলুম- অত্যাচারে, দৈব-দুর্বিপাকে, বিপদে-আপদে শাহজালাল-কে আত্মার বিশুদ্ধতা নিয়ে স্মরণ করে।

হযরত শাহজালাল (রহ)-কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ইতিহাস ও কাহিনীর অধিকাংশই জনশ্রুতি নির্ভর। মানুষের বিশ্বাসে, ভক্তিতে যুগের পর যুগ ধরে এসব মাহাত্ম এবং কাহিনী উচ্চারিত হয়ে আসছে । আমাদের রাজনীতি, সামাজিকতা, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিতে এ মনিষীর প্রভাব অপরিসীম।হযরত শাহজালাল (রহ)-এর দরগা বা সমাধিতে সম্মান জানিয়ে দেশের রাজনীতিবিদরা শুরু করেন তাঁদের নির্বাচনী কাজ।

বলা হয়ে থাকে, সিলেট-১ আসনে নির্বাচিত দলই শেষতক দেশের সরকার পরিচালনা করে । সংস্কার হোক, কাকতালীয় হোক বা ভক্তদের বিশ্বাস থেকে হোক স্বাধীন বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। সিলেট অঞ্চলের মানুষ বিশ্বাস করেন, এই পুণ্যাত্মার সমাধি দৈব্য-দুর্বিপাক থেকে বেঁচে যাওয়ার অন্যতম রক্ষাকবচ। ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে এমন ভূমিকম্প সিলেট নগরীতে এ পর্যন্ত সংগঠিত হয়নি। যাত্রীবাহী বিমান সিলেটের মাটিতে দুর্ঘটনাক্রমে অবতরণ করে এবং অলৌকিকভাবে সকল যাত্রী অক্ষতভাবে রক্ষা পায়। বিশ্বের বিমান দুর্ঘটনার ইতিহাসে বিরল এ ঘটনাকে শাহজালালের মাটিতেই সম্ভব বলে মনে করেন ভক্তরা। আর এ ভাবেই সংস্কার, অলৌকিকতা ও বিশ্বাসে 'শাহজালাল' কোটি মানুষের মনে আজও প্রভাব রাখছেন ।

সিলেট নগরীতে মহান এ সাধকের অন্তিম শয়ান। ছায়াঘেরা উঁচু টিলায় হযরত শাহজালাল (রহ)-এর মাজার শরীফ। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বছরব্যাপী মানুষের সমাগমে মুখর থাকে সিলেট । প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে জনতার স্রোত আসতে থাকে শাহজালাল-এর দরগা অভিমুখে। সাধক পুণ্যাত্মা হযরত শাহজালাল (রহ)-এর সমাধি সম্মুখে দাঁড়িয়ে লোকজন ধ্যানস্থ হন, প্রার্থনা করেন। আত্মার বিশুদ্ধি, জীবনের ব্যাখ্যাহীন অসংলগ্নতা এবং সৎকর্মের প্রেরণার জন্য নানা ধর্ম ও নানা মতের মানুষের এ ধ্যান-প্রার্থনা অতুলনীয় ।

সিলেট অঞ্চলের সামাজিকতায় হযরত শাহজালাল (রহ)-এর প্রভাব খুবই প্রবল। এ মনিষীর নামে দেশ-বিদেশে সংগঠিত হন, একাগ্রতা প্রকাশ করেন পুরো অঞ্চলের মানুষ। ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক ব্যাখ্যাহীন সংকটে লোকজন অবলীলায় ছুটে যান বাবা শাহজালাল-এর দরগায় । মনের প্রশান্তি খোঁজেন ধ্যানে ও প্রার্থনায় । ভক্তদের কেউ কেউ মানতের হাঁস-মুরগী, হাতে তোলা ঘিয়ের বাতি বা ফসলের অংশকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অর্ঘ করে নিয়ে আসেন। প্রতিদিন দরগা কবরস্থানে একাধিক ব্যক্তির দাফন সম্পন্ন হয়। মুসলমান ভক্তদের আকাঙ্ক্ষা থাকে মৃত্যুর পর নিজের ও পরিবারের অন্যদের শেষ ঠিকানা যেন এই পুণ্যাত্মার সমাধি সংলগ্ন কবরস্থানে হয়।

হযরত শাহজালাল (রহ)-এর দরগা জেয়ারতের উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশ থেকে আসা হাজার হাজার ভক্তদের আবাসনের প্রয়োজনে সিলেটে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ক্যাটাগরির হোটেল-মোটেল-রেস্তরাঁ। পুণ্যপুরুষ হযরত শাহজালাল (রহ)-এর নাম যুক্ত করে সিলেটে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান । মাজার জেয়ারতের পাশাপাশি সিলেটের বিভিন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত স্থান দেখাকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পের বিকাশ হয়েছে । তাই সিলেটের অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্যে 'শাহজালাল দরগা'র একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ।

আমাদের সাংস্কৃতিক ভাবধারায় হযরত শাহজালাল (রহ)-এর উপস্থিতি লক্ষণীয়। দেশে কবিদের কবিতায়, গানে মহান এ সাধকের মাহাত্ম্য উচ্চারিত হয়েছে বারবার। লোকগাথায়, পুথিতে, জারীগানে, গ্রাম্য জনপদের লোকজ গানে বাবা শাহজালালের নাম ধ্বনিত হয়ে আসছে। শৌর্য-বীর্যের প্রতীক হিসাবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতীক হিসাবে হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসায় মানুষের ভাবতন্ত্রীতে ভাস্বর হয়ে উঠেন বাবা শাহজালাল । বিদিত লাল দাশ, হিমাংশু গোস্বামী বা জামাল উদ্দিন হাসান বান্না'র কণ্ঠে 'সিলেট প্রথম আজান ধ্বনি বাবায় দিয়াছে / তোরা শোন সে আজান ধ্বনি আজো হইতাছে' গানটি উদ্বেলিত করে কোটি জনতাকে। গ্রাম-জনপদের চারণকবি, মরমী কবিরা অগণিত ভাব / ভক্তি সঙ্গীত রচনা করেছেন বাবা শাহজালাল ও তাঁর সঙ্গি সাথীদের বন্দনায়। যা এখনো অব্যাহত আছে।

হযরত শাহজালাল (রহ)-এর মাজার ও জ্যোতির্ময়তাকে কেন্দ্র করে পুরো এ অঞ্চল জুড়ে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভাবঞ্চল গড়ে উঠেছে। জাত-ধর্ম, ধনী-দরিদ্র মানুষের ভক্তি ও শ্রদ্ধার কেন্দ্রস্থল দরগা শরীফ। প্রতি বছর উরশ উপলক্ষে লাখো মানুষের সমাগম হয় সিলেটে। ধ্যানে, ভক্তিতে, প্রার্থনায়,সঙ্গীতে যে যার মত করে যোগ দেয়ায় মহাউৎসব হয় তাঁর বাৎসরিক উরশ মোবারক।

হযরত শাহজালাল (রহ)-কে কেন্দ্র করে গণমানুষের এ সম্মিলিত উদ্দীপনার বিরুদ্ধে একটি গোষ্ঠীর অবস্থান। প্রায় সাত'শত বছর ধরে চলে আসা ভক্তদের এই মিলন মেলাকে বন্ধ করতে ও বিতর্কিত করতে নানান অপচেষ্টা অব্যাহত আছে। মাজারের ঐতিহ্যবাহী গজার মাছের পুকুরে বিষ ঢেলে মাছ হত্যা, ২০০৩ সালের উরশ উদযাপন কালে বোমা হামলার মাধ্যমে ভক্তদের হত্যা করার পেছনে যে অপশক্তি জড়িত রয়েছে এরাই বৈশ্বিকভাবে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক। জুম্মার নামাজ শেষে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের উপর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় বোঝা যায় এরা ভালোবাসা দিয়ে নয়, কাপুরোষোচিত হামলা ও রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে ইসলাম কায়েম করতে চায় । হযরত শাহজালাল (রহ) আধ্যাত্মিকতা ও মানবতার জয়গাঁথা দিয়ে মানুষের মনে ভক্তির আসন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তরবারি দিয়ে নয়, ন্যায় বিচার ও ভিন্ন ধর্মের মানুষকে স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মাচার করার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন বলেই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবাই 'জয় বাবা শাহজালাল' উচ্চারণের মধ্য দিয়ে নিত্য মূর্ত হয়ে উঠেন। জটিল জীবনের ব্যাখ্যাহীন সংকটে আধ্যাত্মিক প্রশান্তির প্রতীক হয়ে উঠেন । তাই কোটি ভক্তের নিত্য উচ্চারণে শাহজালাল বাবার মহাত্ম ছড়িয়েছে শতাব্দীর সীমানা পেরিয়ে ।

  • ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন: সাংবাদিক, নিউইয়র্ক

আপনার মন্তব্য

আলোচিত