আজ সোমবার, , ২৬ জুন ২০১৭ ইং

মানবতাবাদী নজরুল থেকে ইসলামি কবি বিলকুল

 প্রকাশিত: ২০১৭-০৫-৩১ ১৩:২৫:০১

ফরিদ আহমেদ:

বাংলা সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িক এবং মানবিক চেতনা-সম্পন্ন যে সমস্ত কবি সাহিত্যিক আছেন, তাঁদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের নাম সবার উপরেই থাকবে। তিনি শুধুমাত্র সাহিত্যচর্চাতেই তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, এর অনুশীলন ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক পর্যায়েও করেছেন। কাজেই 'মুখে, মুখেই প্রগতিশীল, বাস্তব জীবনে না', এরকম অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে আনার কোনো সুযোগ নেই। এরকম একজন অসাম্প্রদায়িক সাহিত্যিককে যখন মুসলিম বা ইসলামি কবি হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই নড়েচড়ে বসতে হয় বিষয়টা কী সেটা জানার জন্য। আজকের বাংলাদেশে নজরুল একজন ইসলামি কবি। টুপি মাথায় চাপানো নজরুলের ছবি পুনঃ পুনঃ প্রকাশ করে সবার চোখে এটাই প্রমাণ করা হয় যে তিনি একজন ধার্মিক কবি ছিলেন। কিন্তু, নজরুলের জীবদ্দশার বাস্তবতা এই বাস্তবতার পুরো বিপরীত ধরনের। নজরুল আস্তিক ছিলেন, নাকি নাস্তিক ছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ। তবে, বাস্তব জীবনে তিনি যে কখনো ধর্ম-কর্ম পালন করেন নাই, সেটা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

ধর্ম পালন করুন আর না করুন, ধর্মীয় মোল্লাদের সাথে তাঁর যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক ছিলো সেটা সবাই জানতো। তিনি অসংখ্য শ্যামা সংগীত রচনা করেছেন বলে মোল্লারা তাঁকে কাফের কাজী হিসাবে আখ্যায়িত করতো। এর পাল্টা হিসাবে নজরুল তাদের মৌ-লোভী ডাকতেন। তাঁর ভাষাতেই, মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ' মোল্লা'রা ক'ন হাত নেড়ে',/'দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে! বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, এরা তখন হাদিস কোরান ঘেঁটে বিবি তালাকের ফতোয়া খোঁজা ছাড়া আর কোনো কাজ করছে না বলে নজরুল মনে করতেন। নজরুলের এই গোলমাল শুধুমাত্র যে মোল্লাদের সাথেই ছিলো, তা নয়। হিন্দু পুরোহিতদের সাথেও তাঁর সম্পর্ক ছিলো তিক্ততার। এদেরকেও তীব্রভাবে আক্রমণ করেছেন তিনি। মানুষের চেয়ে ঈশ্বর বা ভগবানের গুরুত্ব এদের কাছে বেশি, এটা তিনি কখনোই মানতে পারেননি। তাইতো তিনি তাঁর “মানুষ”কবিতায় লিখেছেন, "তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী, মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী।"

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এরকম একজন অসাম্প্রদায়িক কবি, ঠিক কোন ভিত্তিতে একজন মুসলিম বা ইসলামি কবি হয়ে উঠলেন? কাজী নজরুল ইসলাম, একদিন ভবিষ্যৎকালে, জন্ম হয়নি এমন এক দেশের মুসলিম কবি হয়ে ওঠবেন, ইতিহাসের এই মোড় ঘোরানো মোচড়টা নিজের অজান্তেই যিনি দিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি হচ্ছেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমদ।

আব্বাসউদ্দিন আহমদ এর শখ ছিলো তিনি নজরুলকে দিয়ে ইসলামি সংগীত রচনা করবেন। বেশ কিছুদিন এই বাসনা মনে চেপে রাখার পর একদিন তিনি সত্যি সত্যি চেপে ধরলেন নজরুলকে।

“কাজীদা, আপনি বাঙলা দেশে আলেম-সমাজে কিন্তু ঠাঁই পেলেন না, ওরা তো আপনাকে কাফের ফতোয়া দিয়েছে। আচ্ছা, পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়াল, এঁরা উর্দুতে কী সুন্দর কাওয়ালি গান করেন। এই ধরনের বাংলা গান যদি লিখে দেন তাহলে সমাজের অনেক কাজ করা হবে।”

নজরুল এই আবদার শুনে শুধু বললেন, “ভগবতীবাবুর কাছ থেকে অনুমতি নাও এ ধরনের গান লিখবার।”

ভগবতী ভট্টাচার্য ছিলেন গ্রামোফোন কোম্পানির প্রতিনিধি। আব্বাসউদ্দিন আহমদ তাঁর কাছে এই প্রস্তাব নিয়ে যেতেই তিনি এটাকে নাকচ করে দিলেন এই বলে যে এই ধরনের রেকর্ড বাজারে বিক্রি হবে না। ভগবতী বাবুর অনুমতি না পাবার পরেও আব্বাসউদ্দিন আহমদ হাল ছাড়লেন না। একদিন তিনি এক ঠোঙা পান নজরুলের সামনে রেখে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আধা ঘণ্টার মধ্যে নজরুল লিখে ফেললেন “ও মন, রমজানের ওই রোজার শেষে”আর “ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলো নবীন সওদাগর”গান দুটো।

গান যখন লেখাই হয়ে গেছে, তখন ভগবতী বাবুকেও রাজি করানো সম্ভব হলো। চারদিনের মধ্যে দুটো গানের রেকর্ডিং শেষ হলো। রেকর্ডিং শেষ করে আব্বাসউদ্দিন মাস দুয়েকের জন্য বাড়ি ফিরে এলেন। কোলকাতায় ফিরলেন একেবারে ইদের শেষে। সেখানে গিয়ে তিনি হতবাক। সারা কোলকাতার আকাশে বাতাসে বাজছে তাঁর গাওয়া গান। তাঁর মুখেই শুনি আমরা সেই বিবরণঃ

“ঈদের পর কলকাতায় ফিরে গিয়ে শুনি কলকাতার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ। রোজ বিকেলে, গড়ের মাঠে গিয়ে বসি, পাশেই কেউ না কেউ গুন গুন করে গেয়ে ওঠে, ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে’। শুনে কী যে আনন্দ হতো!”

এই গানের রেকর্ডিং থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আসতে লাগলো গ্রামোফোন কোম্পানির পকেটে। যে ভগবতী বাবু একদিন এসব গান চলবে না বলে নাকচ করে দিয়েছিলেন, সেই তিনি আব্বাসউদ্দিনকে অনুরোধ করলেন নজরুলের কাছ থেকে এই ধরনের গান আরো লিখিয়ে আনতে। শুরু হয়ে গেলো ইসলামি সংগীতের বিজয়-রথ। এই গানগুলো তখন মুসলমান সমাজে বিপুল উল্লাস তৈরি করে ফেলেছে। রেকর্ড বের হবার সাথে সাথেই ব্যাপক পরিমাণে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

বিখ্যাত গায়ক কে মল্লিক, শ্যামা সংগীত এবং রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে তখন দারুণ জনপ্রিয়। ভদ্রলোক আদতে মুসলমান। প্রকৃত নাম মহাম্মদ কাসেম। একজন মুসলমান শ্যামা সংগীত গাইলে হিন্দুরা শুনবে না এই আশংকায় নিজের নাম লুকিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। ইসলামি গানের এই জোয়ারে তিনি তাঁর সেই হারানো আইডেন্টি খুঁজে পেতে চাইলেন। তিনি এসে আব্বাসউদ্দিনকে ধরলেন তাঁর জন্যও ইসলামি গান লিখে দেবার জন্য।

গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে প্রতি মাসে বের হতে থাকলো ইসলামি সংগীতের রেকর্ড। মুসলমান শিল্পী কম বলে হিন্দু শিল্পীদের মুসলমান নাম দিয়ে গান রেকর্ড করাতে লাগলো গ্রামোফোন কোম্পানি। ধীরেন দাস রেকর্ড করলেন গণি মিয়া নামে, চিত্ত রায় হয়ে গেলেন দেলোয়ার হোসেন, গিরিন চক্রবর্তী নাম নিলেন সোনা মিয়া আর হরিমতি হয়ে গেলেন সাকিনা বেগম।

এই ইসলামি সংগীত লেখার কারণেই, নজরুলের সময়ের মোল্লারা, যারা তাঁকে কাফের ঘোষণা দিয়েছিলো, তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক নতুন দেশে তাঁকে ইসলামি কবি বানিয়ে দিলো। এই ভবিষ্যৎ মোল্লা প্রজন্ম ইতিহাস বিষয়ে অজ্ঞ, সাহিত্য মূর্খ, সাম্প্রদায়িক এবং নজরুল বিষয়ে খণ্ডিত জ্ঞানের অধিকারী। সেই খণ্ডিত জ্ঞান দিয়ে নজরুলের খণ্ডিত ইমেজ তৈরির বাইরে এদের কাছ থেকে বেশি কিছু আশা করাটাও বাতুলতা মাত্র।

নজরুল ইসলাম ইসলামি সংগীত লিখেছেন, ইসলামের ইতিহাসমৃদ্ধ কবিতা লিখেছেন, এতে দোষের কিছু নেই। বরং তাঁর মতো উন্নত সাহিত্যিকের হাতে পড়ে বাংলা সাহিত্যের এই অংশ সমৃদ্ধ হয়েছে, সেটা অত্যন্ত মঙ্গলকর। তিনি শ্যামা সংগীত লিখেছেন, সেটাও ধর্মকেন্দ্রিক সাহিত্য। তা নিয়ে যেহেতু কোনো প্রশ্ন তোলা হয় না, ইসলামি সংগীত নিয়েও প্রশ্ন তোলার কোনো মানে নেই। সমস্যাটা হয়েছে বাংলাদেশের এইসব নব্য মোল্লাদের নিয়ে। বাংলাদেশ সরকার যখন নজরুল ইসলামকে ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসে এবং জাতীয় কবি বানায়, তখন তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্রও কাজ করেনি যে তাঁরা এটা করছেন নজরুল ইসলাম মুসলমান বলে। তাঁকে হিন্দু কবি রবীন্দ্রনাথের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে, এরকম ভাবনা দুঃস্বপ্নেও তাঁরা ভাবেননি। মুসলমান কবিদের কাউকে জাতীয় কবি করতে হলে তখন হাতের কাছে মহাকবি কায়কোবাদ, কবি গোলাম মোস্তফারা তৈরি অবস্থাতেই ছিলেন। এর জন্য ভারত থেকে নজরুল ইসলামকে আমদানি করার কোনো প্রয়োজন ছিলো না। কিন্তু, আজকে দুর্ভাগ্যজনকভাবে একজন মানবতাবাদী কবিকে, যিনি খোলা আকাশে মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়তে চেয়েছেন, তাঁর ডানা ভেঙে দিয়ে ছোট্ট এক সাম্প্রদায়িক খাঁচার মধ্যে পুরে দেওয়া হচ্ছে। এই দুর্ভাগ্য শুধু নজরুলের একার নয়, এই দুর্ভাগ্য আমাদের সকলের, সমগ্র বাঙালি জাতির।

আপনার মন্তব্য