আজ বৃহস্পতিবার, , ১৯ অক্টোবর ২০১৭ ইং

ইতিহাস পাঠের নতুন জানালা

গ্রন্থালোচনা

 প্রকাশিত: ২০১৭-০৭-০৭ ২০:১৫:১৪

প্রণবকান্তি দেব:

[‘মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি : প্রবাসে আলোর গান’, লেখক : হায়দার আলী খান, প্রথমা প্রকাশ, প্রকাশকাল-অক্টোবর ২০১৬, মূল্য- ২৫০টাকা।]

বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধ কী শুধুই ছাপান্নহাজার বর্গমাইলের ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল? একাত্তরে নয় মাসব্যাপী দ্রোহ-সংগ্রাম, প্রতিবাদ-প্রতিরোধে কী শুধু নির্দিষ্ট ভূসীমানার জনগনই ছিল সক্রিয়? বিয়োগ- বেদনা আর ক্ষোভ- বিক্ষোভে কী শুধু পুড়ছিল এতদঞ্চলেরই মানুষের মন? এই বিহ্বল জড়ানো প্রশ্নগুলোর সরল উত্তরে লেখা একটি গ্রন্থ অধ্যাপক হায়দার আলী খান এর ‘মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো, প্রবাসে আলোর গান’।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্বের স্মারক, বাঙালি-জীবনের এক হিরন্ময় অধ্যায়। উল্লেখিত গ্রন্থপাঠে মনে হয়, ‘না’, মুক্তিযুদ্ধ শুধু এই ছাপান্নহাজার বর্গমাইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং একাত্তর সালে পৃথিবীর যে প্রান্তেই কোনো একজন বাঙালী ছিল, সেখানেও যে যুদ্ধ হয়েছিল তার এক প্রামান্য দলিল এ বইটি। হ্যাঁ, সেসব স্থানে হয়তো রক্তপাত হয়নি, গেরিলা আক্রমন হয়নি কিংবা শত্রুর মুখামুখিও হয়নি কেউ অস্ত্রসহ। তথাপি পৃথিবীজুড়ে বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত একজন রাজনীতি সচেতন বাঙালী তরুণের চিন্তার জগতজুড়ে স্বাধীনতা ও সর্বভৌমত্বের জন্য যে যুদ্ধ হয়েছিল তার ব্যক্তিক বর্ণনা ধারন করেছে আলোচ্য গ্রন্থটি। কিন্তু  লেখকের স্মৃতি তর্পন অবলীলায় মিশে গেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বর্ণালী ইতিহাসের সাথে।

মোট বিয়াল্লিশটি উপশিরোনামে বিভক্ত একশছত্রিশ পৃষ্টার এ গ্রন্থের ভূমিকায় প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক মনজুরুল হক বলে দিয়েছেন- ‘বুকে আগুন আর চোখে জল নিয়ে লেখা এই কাব্যিক আখ্যান’। হৃদয়ছোঁয়া এ বাক্য পাঠের পর আর তো বুঝতে বাকী থাকে না ভেতরের খবর।

‘ন্যারেটিভ লিটারেচার’ বা বর্ণনামূলক সাহিত্যের অঙ্গকাঠামোয় লেখা এ গ্রন্থটি লেখকের ব্যক্তিগত ঘটনা, অভিজ্ঞতা আর স্মৃতি পাঠে সমৃদ্ধ। কিন্তু তার চেয়ে বড়ো ব্যাপারটি হলো, একাত্তরে প্রবাসে বসে থাকা এক তরুণের মানসজগত জুড়ে কীভাবে বাসা বেধেঁছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন- আকাংখা, কেমন করে ভেতরে তিনি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন দ্রোহ-প্রদীপ, ফিরতে না পারার বেদনা, যুদ্ধে যোগ দিতে না পারার হাহাকার- সেসব কিছুই বিধৃত হয়েছে বইয়ের প্রতিটি পাতায়।

গ্রন্থের লেখক প্রফেসর হায়দার আলী খান একাত্তরে ছিলেন উচ্চ মাধ্যমিক পড়–য়া এক টগবগে তরুণ। সেই জানুয়ারিতে আমেরিকা গিয়েছিলেন তরুণদের এক সম্মেলনে যোগ দিতে। অতঃপর আর ফেরা হয়নি তার... যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে প্রফেসর হায়দার ফিরতে পারেননি তার প্রিয় মাতৃভূমিতে। সূদুর প্রবাসে বসে শুধু বুক চাপড়ে গেছেন, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং নানা বর্ণের উত্তেজনার সারসংক্ষেপ বন্দী করেছেন এ গ্রন্থে। উদাহরণ হিসেবে ধরে নিতে পারি তার ‘২৬ মার্চের সেই দুঃসহ সকাল’ শিরোনামের স্মৃতি আলেখ্যের কথা। লেখক বলছেন-

‘২৬ মার্চের সেই সকালটির কথা আমার চিরদিন মনে থাকবে।... হ্যালো হায়দার (আমেরিকানরা দ এর সঠিক উচ্চারণ করতে পারে না বলে তাঁর গলায় আমার নামটি ‘হায়ডার’ এর মত শোনাচ্ছিল), আই হ্যাভ সাম ব্যাড নিউজ ফর ইউ। তোমার জন্য দুঃসংবাদ আছে।’ বলেই উনি প্রায় দশ মিনিট ধরে ঢাকায় ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার কথা শোনালেন। আমি প্রায় বিমূঢ় হয়ে শুনতে লাগলাম। তাঁর দেওয়া বিবরণ খুব পুঙ্খানুপুঙ্খ না হলে আমার কিশোর মন দেশে কি ঘটছে সে বিষয়ে কিছুটা আঁচ করে নিতে পেরেছিল।’ (পৃ:২৩/২৪)

দেশে মরণপণ যুদ্ধ চলছে, স্বজনরা কে, কোথায়? কোথায়ইবা গড়াবে দেশের ভবিষ্যত? ইত্যকার নানা ভাবনায় উদ্বেগাকুল এক লেখক হৃদয় তখন প্রবাসের মাটিতে বসে অন্তরদৃষ্টি দিয়ে দেখছেন প্রিয় বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের মাটিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে লেখক তার কাব্যিক ভাষা শৈলীতে, সরল ভাবাবেগে বর্ণনা করেছেন- কখনো ঢাকায় অবস্থানকালীন নানা স্মৃতি, কখনো বয়ান করেছেন রাজনীতিক সহযোদ্ধাদের কথা, কখনো বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আমেরিকায় চলমান ঘটনাপ্রবাহ। আমরা তাই এ গ্রন্থটিকে মুক্তিযুদ্ধের ডায়রী বলেও অভিহিত করতে পারি। যেমন ‘ওয়াজেদ ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম দেখা ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ’, ‘শেখ কামালের সঙ্গে কিছু স্মৃতি’ শিরোনামের দুটি প্রবন্ধে আমরা লেখকের রাজনীতিক স্বপ্নোত্থান আর শোষন মুক্ত সমাজ প্রতিষ্টার লড়াইয়ের অন্তরঙ্গ আলাপচারিতার সাক্ষ্য পাই।

একই সাথে পাই ষাটের তারুণ্যের রাজনীতি সচেতনতার কিছু স্থির চিত্রও। গোলাবারুদে যখন পুড়ছে আমাদের নরম মাটি তখন আমেরিকাতেও শুরু হয়ে গেছে মুক্তির স্বপক্ষে আন্দোলন-সংগ্রাম। ‘নিউইয়র্কের রাজপথে বাংলাদেশের মুখ’ শিরোনামের নিবন্ধে তার কাব্যিক উচ্চারণ- “নিউইয়র্কের রাজপথেও/বসন্তের রক্তলাল দিনে/মরে পড়ে আছে সেই কংক্রিটের কোকিল?”
অন্যদিকে, যে পাকিস্তানের সাথে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম চলছে বাংলাদেশের জমিনে, সেই পাকিস্তানেরই এক নাগরিক বুদ্ধিজীবী একবাল আহমদ এর আমাদের স্বাধীনতার প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন, আমাদের করুণ দিনগুলোর প্রতি সহানুভুতি আমাদেরকে অন্যরকম ভাবনার খোরাক যোগায়। ‘একবাল আহমদ ও আমাদের আন্দোলন’ প্রবন্ধে একবালের কণ্ঠে যখন কবিতার এই পংক্তি- ‘চালে-চলো কে উয়ো মনজিল আভি নাহি আয়ি’ শুনি, তখন আমরাও উদ্দীপ্ত হই।

এভাবেই লেখক তাঁর স্মৃতির ডালা সাজিয়েছেন বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামে আমেরিকার বুকে জেগে উঠা ঘটনাপ্রবাহের মালা দিয়ে। এর মধ্যে উজ্জ্বল্যে ছড়ায় ‘বিচারপতি চৌধুরী, মাহমুদ আলী, এফ আর খান ও অন্যান্য বাঙালী’, ‘বাংলাদেশ লিগ অব আমেরিকা ’, কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, অ্যালেন গিনসবার্গের সঙ্গে কয়েকটি সন্ধ্যা’ ইত্যাদি নিবন্ধগুলো। এছাড়াও ‘দেশ-বিদেশের বন্ধু এবং আমাদের সংগ্রাম’ এবং ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ প্রভৃতি নিবন্ধগুলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনেক তথ্য সংযোজন করে। আমাদের জানার জগৎকে আরো প্রসারিত করে।

সব মিলিয়ে, হায়দার আলী খান এর ‘মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো প্রবাসের আলোর গান’ গ্রন্থটি আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের পূর্ণপাঠই বলা যায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনুশীলনে এ গ্রন্থটি নতুন প্রজন্মের কাছে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত স্মৃতির আড়ালে লেখক পাতায় পাতায় বিন্যস্ত করেছেন একটি জাতির উদ্ভবকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর আরেক প্রান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো। বইটি পড়তে পড়তে মনে পড়ে যায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এর ‘অ্যামেরিকান রেসপনস টু বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার’ গ্রন্থটির কথা। আলোচ্য বইয়ের অনেক ঘটনাবলীর বিবরণ আমরা মুহিতের বইতেও পাই।

এখানে উল্লেখ্য যে, বর্ণনায় স্বাতন্ত্র্য থাকলেও তথ্যে কোনো ফারাক নেই। তাই এ গ্রন্থে ইতিহাস বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই। সেদিক বিবেচনায় হায়দার খানের গ্রন্থকে আমাদের ইতিহাস পাঠের নতুন জানালা হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। পুরো গ্রন্থজুড়ে বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে লেখকের কবি মনের পরিচয়, বিভিন্ন কবিতার উদ্ধৃতি গ্রন্থকে পাঠ উপভোগ্য করে তুলে। অতএব, সবিনয় নিবেদন সবাইকে বইটি পড়ি, আরেক সীমানা থেকে বহুদুরে একাত্তরের বাংলাদেশকে জানার ব্যাকুলতা নিয়ে। শেষ করছি, লেখকের শেষ কথামালা দিয়ে-
‘শীতে-বসন্তে আনন্দ-বিষাদে
যাযাবর পথচলা অবিরাম
পথিকের প্রেম
জীবনের গভীর আহ্বান।’

আপনার মন্তব্য