আজ সোমবার, , ২০ নভেম্বর ২০১৭ ইং

আড্ডাপ্রিয় মুজতবা আলী

 প্রকাশিত: ২০১৭-০৯-১৩ ১৬:২৩:৪১

অপূর্ব শর্মা:

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘মানুষ মানুষের নগদ প্রীতি চায়। এই মাটির পৃথিবীতেও অমরাবতী আছে। মানুষের কাছে মানুষের প্রীতি তারই মধ্যে একটি প্রধান অমৃতরস, মরার পূর্বে, এ যদি আঞ্জলিভরে পান করিতে পাই তা হলে মৃত্যু অপ্রমাণ হয়ে যায়।’

বাংলা সাহিত্যে যে ক’জন সাহিত্যিক জীবদ্দশায় মানুষের প্রীতি ভালবাসা পেয়েছিলেন তারমধ্যে সৈয়দ মুজতবা আলী অন্যতম। মানুষকে তিনি যেভাবে আনন্দের প্রীতিডোরে আবদ্ধ করেছিলেন- সেভাবে মানুষও তাঁকে ভালবাসার অমৃতরসে সিক্ত করেছিল। মানুষকে তিনি যেভাবে মাতিয়ে রাখতে ভালবাসতেন শব্দশৈলীতে সেভাবে মানুষও তাঁর সাহচর্য পেতে ভালসতো। সেইসব মানুষ, যারা সত্যিকার অর্থে বাংলা সাহিত্যকে ভালবাসতো, তাদের অনুরাগে সিক্ত হতেন তিনি। মুজতবা আলীর মানুষের সহচর্য ও মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা পাবার পেছনে কাজ করেছে রসবোধ এবং তাঁর অসীম জ্ঞানের ভাণ্ডার। তাঁর শব্দ সচেতনতায়ও মানুষ আকৃষ্ট হয়েছে তাঁর প্রতি।

মুজতবা আলী ছিলেন আড্ডাপ্রিয়। সুযোগ পেলেই আড্ডা দিতেন। এক কথায় বলা চলে ‘আড্ডাবাজ’। তবে সেই আড্ডার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থাকতো রসাত্ববোধ। হাসির ফোয়ারা বইয়ে দিতেন তিনি। তাঁর রচনায় যেভাবে জীবনবোধ চিত্রিত হয়েছে ঠিক তেমনি করে কথার মধ্যেও ছিলো হাসির মনিমুক্তা। তাঁর শব্দের আনন্দ উপভোগ করতে অনেকেই তাঁকে নিয়ে, তাঁর সাথে আড্ডায় মশগুল হতে ভালবাসতেন। ছুটে যেতেন তাঁর কাছে। তবে তিনি শুধু অভ্যাগতদের হাসির তরঙ্গেই দোলায়িত করতেন না, তাঁর কথার মধ্যে থাকতো শেখার অনেক কিছু। বহুদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা যেমন তিনি তুলে ধরতেন, বিড়ম্বনাও ঠাই পেতো আড্ডায়। আড্ডাকে একাই মাতিয়ে রাখতেন। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সবাই শুনতো তাঁর কথা।

ড. আশরাফ সিদ্দিকী ‘যা দেখেছি, যা পেয়েছি, যা জেনেছি’ বইয়ে মুজতবা আলীর সাথে আড্ডা প্রসঙ্গে লিখেছেন ‘... শুরু হলো টাকের গল্প- পৃথিবীতে কোন কোন মনীষীর টাক ছিল- টাকের উপকারিতা- চুলের অপকারীতা শেষ পর্যন্ত এক জার্মান দম্পতির গল্প। মাথার লম্বা চুল থাকাতে কিভাবে ট্রেনের অটোমেটিক দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে পুরো ৫০ মাইল রাস্তা একরূপ চুলে দরজায় বাদুরঝোলা ঝুলতে ঝুলতে শুধু চুল নয়- নাক পর্যন্ত হারাতে হয় এবং খাঁদা নাকের জন্য প্রিয়তমা পত্মীকেও। টাকের আরেক সুবিধা হলো পরোপকার। বিগত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর নাকি দরিদ্র ইউরোপবাসীগণ আয়নার অভাবে টেকোদের সামনে রেখে কেশ বিন্যাস করতো। বিশেষ করে কেশ-বিলাসিনী মহিলাদের কাছে টেকোদের নাকি যুব কিস্মত বেড়ে যায়।’

১৯৭০ সালে ড. আশরাফ সিদ্দিকী ধানমন্ডি ৭নং রোডে অবস্থিত সৈয়দ মুজতবা আলীর বড় ভাইয়ের বাসায় তাঁর সাথে দেখা করতে গিয়ে প্রথমেই ‘উর্ধ্ব দেশে পরিবর্তন দেখছি’ বলার সাথে সাথেই তাঁকে এই গল্প শুনান মুজতবা আলী। অন্য আরেক দিনের আড্ডায় এই প্রথিতযশা তাকে শুনিয়েছিলেন ‘দুনিয়ার কে কে হাসিতে ডক্টরেট? হাসতে পারতেন কারা কারা? হাসিও একটা আর্ট। হাসতেন নজরুল ইসলাম। যাকে বলে কাঠফাটা হাসি। হাসতেন ডি.এল রায়। প্রমথ চৌধুরী। প্রমথ বিশী। কিন্তু ‘র-ব’ অদ্যাক্ষরধারীরা হাসতে জানতেন না। র-মানে রবীন্দ্রনাথ, ব-বুদ্ধদেব ইত্যাদি।’

হাস্যরসের অফুরন্ত ভাণ্ডার মুজতবা আলীর বাচনভঙ্গি ছিল অতুলনীয়। তিনি কথা বলতে শুরু করলে তার মুখমণ্ডল দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। গভীর ধর্ম কথাকেও তিনি চটুল হাস্যরসে সিক্ত করে উপস্থাপন করতে পারতেন। বলা হয়ে থাকে, শান্তি নিকেতনের আড্ডা-ই সৃষ্টি করেছিলো মুজতবা আলীর মনোভূমিতে রসাত্মবোধ। অনেকের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও আড্ডা দিয়েছে যোগান।

হীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায়- ‘বিশ্বভারতীর প্রথম যুগের ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য শিল্পী হিসাবে বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় এবং রামকিঙ্কর বেজ আর সাহিত্যিক হিসাবে প্রমথনাথ বিশী ও সৈয়দ মুজতবা আলী। এঁদের সকলকেই আমি জানি; এঁদের অন্যান্য অনেক গুণের মধ্যে অন্যতম প্রধান গুণ এরা সকলেই প্রথম শ্রেণীর আড্ডাধারী। আমার মতে, আড্ডা জিনিসটা এঁদের প্রতিভায় অনেকখানি পুষ্টি জুগিয়েছে, আবার আড্ডার বেলায় সৈয়দ এঁদের সকলকে ছাড়িয়ে। আড্ডা যে শান্তি নিকেতনের কী প্রভূত কল্যাণ করেছে সে কথা কেউ আর এখন ভাবে না। রবীন্দ্রনাথ নিজেও যে একজন আড্ডাধারী ব্যক্তি ছিলেন সে কথাও অনেকে ভুলে গিয়েছেন।’

মুজতবা আলীর ইচ্ছে ছিল শান্তিনিকেতন নিয়ে লেখার। জীবন সায়হ্নে এসে অনেকের কাছে নিজের আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেনও তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর তা লিখতে পারেন নি। শান্তি নিকেতনে অবস্থানকালীন সময়ের কথা লিপিবদ্ধ করতে পারলে শান্তিনিকেতনের আড্ডার অনেক কথাই জানা যেত। সেই সময়ের কথাই যেনো উঠে এসেছে গৌরিকিশোর ঘোষের বক্তব্যে- ‘মুজতবা প্রসঙ্গ’ বইয়ে তিনি ‘তমোগ্ন মুজতবা নিবন্ধে লিখেছেন- ‘আড্ডা এবং সৈয়দ মুজতবা আলী, এছিল সমার্থক। এরকম আড্ডাধারী আর হবে না; কেননা এত বিচিত্র বিষয়ে, এত সরস চুটকী ছেড়ে আড্ডাকে সর্বক্ষণ জিইয়ে রাখার ক্ষমতা সকলের থাকে না। অমন মেজাজও না।...সৈয়দার গোটা জীবনটাই ছিল আড্ডা কেন্দ্রিক।’

মুজতবা আলী কথা বলতে শুরু করলে ঘন্টার পর ঘন্টা তা অব্যাহত রাখতে পারতেন। এক কথায় বলা চলে তিনি ছিলেন অনর্গল বর্ষী। আজীবন আড্ডাধারী মুজতবা আলী যেখানেই গিয়েছেন, সেখানেই জামিয়েছেন আড্ডার পাঠ। বিশ্বভারতীয় প্রাঙ্গণে কিংবা বার্লিনের হিন্দুস্থান হাউসে, কায়রোর কফিখানায় কিংবা নিজ আলয়ে- যখন যেখানে অবস্থান করেছেন সেখানেই নিসৃত হয়েছে তাঁর কথার ফুলঝুড়ি। আশ্বর্য হবার বিষয় ছিলো, কথা বলার সময় উদ্ধৃতির জন্য কখনও তিনি থমকে যেতেন না। প্রখর ছিল তাঁর স্মৃতিশক্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কবিতা এবং ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবন্ধ তাঁর মুখস্থ ছিল। মাইকেল মধুসুদন দত্তের মেঘনাধ বধ কাব্য থেকেও অনর্গল বলে যেতেন তিনি।

‘মুজতবা কথা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ বইয়ে মুজতবা আলীর সহোদর লেখক সৈয়দ মুর্তাজা আলী লিখেছেন- ‘মুজতবা আলীর কথাবার্তা আয়াসহীন, দ্বিধাহীন ও রসসমৃদ্ধ হয়ে অবিরাম ধ্বনিত হয়ে শ্রোতাদের মনে চমক লাগাত। যারা তার বৈঠকে শামিল হননি, তারা তার কথার ফুলঝুরির বর্ষণ অনুমান করতে পারবেন না। তার মত মজলিশী কথক খুবই কম পাওয়া যায়। তার অনর্গল কথনের মধ্যে বিদ্যার এক অদ্ভূত বিকিরণ ঠিকরে পড়ত। তিনি যা কিছু দেখেছেন বা জেনেছেন তা এমন চটুল ভাষায় সরসতামণ্ডিত করে পরিবেশন করতেন, যাতে সকলের আনন্দ ও জ্ঞান বৃদ্ধি হত। সাধারণের ধারনা পাণ্ডিত্য এমন জিনিস যা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে শো-কেসে সাজিয়ে রাখতে হয়। সাধারণের নাগলের বাইরে। পাণ্ডিত্য যার বেশি, তিনি উগ্র স্বভাবের হন, মিতবাক হন ও গম্ভীর প্রকৃতির হন। মুজতবা ছিলেন ঠিক তার বিপরীত।’

বহুভাষাবিদ মুজতবা আলীর শব্দ ভাণ্ডার ছিলো সমৃদ্ধ। কথা বলার সময় তিনি শব্দমালা সাজাতেন নিখুঁতভাবে, দ্রুততর সময়ে। নানান অপ্রচলিত শব্দ চালু করে, শব্দ সৃষ্টিতে পারঙ্গমতা দেখিয়ে বাংলা সাহিত্যের রম্য রচনার ধারাকে তিনি যেভাবে গতিশীল করেছেন তা অতুলনীয়। তিনি বাংলা সাহিত্যে যেভাবে ব্যতিক্রমী ধারার প্রচলন করেছিলেন সেভাবে তাঁর ব্যক্তি জীবনও ছিল সমৃদ্ধ। কেউ কেউ বলে থাকেন- ‘এক জীবনেই তিনি কাটিয়ে গেছেন অনেক জীবন।’ আর তাঁর জীবনের অন্যতম অনুসঙ্গ ছিল আড্ডা। তাঁর সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে কখনও-সখনও বিরক্ত হতেন কেউ কেউ। কারণ তিনি যখন কথা বলতে থাকতেন তখন সুযোগ পেতেন না অন্যরা। তবে এজন্য কখনও কারো ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটেনি।

‘মুজতবা কথা’ প্রবন্ধে আমীনূর রশীদ চৌধূরী লিখেছেন, ‘ড: সৈয়দ মুজতবা আলীর সহিত বৈঠকি আলাপে যাহারা বসিয়াছেন, তাহারা জানেন যে, মন্ত্রমুগ্ধের মত বসিয়া বসিয়া কেবলমাত্র শুনিয়া যাওয়া ছাড়া আর কিছু করা বা বলা নিরর্থক। সময় কেমন করিয়া প্রসঙ্গ হইতে প্রসঙ্গান্তরে লইয়া গিয়া কেবলই আরও জানিবার, শিখিবার ও বুঝিবার জন্য নিজেকে তৈরী করিতে থাকে, তাহা ড. আলী বৈঠকে যাহারা যোগ একবারও অন্ততঃ দিয়াছেন, তাহারা অস্বীকার করিতে পারেন না। কাহাকেও একটি ব্যাপার সম্বন্ধে বলিতে গিয়া ড. আলী প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের ভাষা, সমাজ ধর্ম ও রীতি নীতির যে প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলীর অবতারণা করিতেন, তাহা তুলনা রহিত এবং বিরলও বটে।’

১৯৭৩ সালে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। তাঁর পক্ষাঘাত হলো, জীবন সায়হ্নে উপনীত হল তরি। কিন্তু মুজতবা আলীকে দমিয়ে রাখা যায়নি। যারাই তাঁকে দেখতে যেতেন হাসপাতালে তাদের সাথে আড্ডা জুরে দিতেন। হাসিও থাকতো মুখে। বোঝার উপায় ছিলো না তিনি অসুস্থ!

‘মুজতবা আলীর রসবোধ’ প্রবন্ধে রশীদ করিম এ প্রসঙ্গে লিখেছেন- ‘মুজতবা সাহেব হাসপাতালে, শরীরের ডান দিকে পক্ষাঘাত। দেখে খুব খারাপ লাগলো, কিন্তু মুজতবা সাহেব নিজে যথারীতি ফুর্তির ফোয়ারা, একটু পরেই মনে হলো, একজন রোগীকে দেখতে আসিনি, এসেছি একটি উৎসবে, তাঁর অসাড় ডান পা-টি একটু টিপে তাঁকে তারই প্রিয় লেখক, পরশু বামের অনুকরণে বললাম, আপনার কিছু হয়নি। হাড্ডি পিলুপিলায় গায়া। খুব হাসলেন তিনি; হাসিটাকে কিন্তু আমার মনে হল জীবন-সংগ্রামের মত। কিছুতেই পরাস্ত না হওয়ার সংকল্পের মত।’

ব্যক্তি জীবনে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন মুজতবা আলী। কিন্তু নিজের দুঃখবোধকে তিনি জানান দেননি। উপরন্তু হাসানোর মত সবচে’ কঠিন কাজটি তিনি করে গেছেন অবলীলায়। তা কখনওবা আড্ডায়, কখনওবা লেখায়।

আপনার মন্তব্য