আজ রবিবার, , ২১ জানুয়ারী ২০১৮ ইং

ভালোবাসার কষ্ট

 প্রকাশিত: ২০১৭-১১-২৪ ০২:৩৩:৩২

 আপডেট: ২০১৭-১১-২৪ ২০:০৪:৩৮

আফরিন জাহান হাসি:

সিলেট শহরের নিম্ন-মধ্য মানের একটি হোটেল, তার টানা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সুস্মিতা আর ওর বন্ধু অনন্ত গল্প করছে। সুস্মিতার কথা শুনে অনন্ত এত বেশি অবাক হয়েছে দেখে সুস্মিতাই উল্টো অবাক! এতে এত অবাক হওয়ার কি আছে!

ওরা একদল ছেলেমেয়ে এসেছিল। সুস্মিতার ভাইও আছে সাথে। সে তার যতটা ভাই, ততটাই বন্ধু। বেশিরভাগই ভোরের ট্রেনে ফিরে গেছে।   

সুন্দর সকাল, হেমন্তের হালকা ঠাণ্ডা বাতাস, সূর্যের নরম রোদ এসে পড়ছে গায়ে। দোতলা থেকে শহরটাকে অনেক শান্ত মনে হচ্ছে।

সুস্মিতার এই প্রথম সিলেটে আসা। গত দু’তিন দিন টই-টই করে ঘুরেছে সবাই। প্রথম দিন যে হোটেলে খেয়েছিল, কী ঝাল তার খাবার! গতকাল তাই ওদের হোটেল থেকে বেশ দূরে একটা দামী রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছিল ওরা। যাওয়া আসার পথটা অনেক সুন্দর।   

চা বাগানে সুস্মিতা অদ্ভুত সুন্দর এক সূর্যাস্ত দেখেছে! গা ছমছম করা সৌন্দর্য। ও অনেক শুনেছে খুব বেশি সৌন্দর্য নাকি সহ্য করা যায় না, এটা কি তাই ছিল! টিলাটা বেশ উঁচু, উঠতে কষ্ট হচ্ছিল, ওর ভাই জোর করে টেনে তুললো। চারিদিকে সবুজ চা বাগান, সামান্য একটু  দাঁড়ানোর জায়গা টিলার মাথায়। সেখানে দাঁড়িয়ে সুস্মিতা,আর তার সামনে বিশাল জ্বলজ্বলে কমলা রংয়ের এক রত্ন! ওর মনে হচ্ছিল এক সবুজ কার্পেটের উপর দাঁড়িয়ে আছে, আর সন্ধ্যার আকাশের এই রহস্যময় রত্ন ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। নিজেকে ভীষণ একা লেগেছিল, এমনিতেও তখন আর কেউ তেমন ছিল না ঐখানে। সুস্মিতা স্থির হয়ে ছিল, নড়তে পারছিল না।

হঠাৎই সুস্মিতার চোখটা একটু নিচে নামাতেই চোখে পড়লো, সামনে আরও একটু নিচু একটা টিলা, তার উপর বিশাল এক দাঁ নিয়ে উদোম গায়ে এক লোক দাঁড়িয়ে আছে, পাশে ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর। সুস্মিতার মনে হলো, যেন রূপকথার দৈত্যপূরিতে চলে এসেছে। ও আর থাকতে পারছিল না, দৌড়ে, গড়িয়ে ঐ চা বাগানের ঢাল বেয়ে নেমে এসেছিল।    

রাতভর আড্ডা দিয়ে ওরা আর ভোরের ট্রেন ধরার চিন্তা করেনি। তাই আজকের সকালটা অনেকটা অলস, তাড়া নেই কোথাও যাবার। বিকেলের ট্রেন এ যাবে ঠিক করেছে। ওরা দুই বন্ধু গল্প করছে। সুস্মিতা বলেছে, কেউ যখন তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়,তখন ওর খুব মন খারাপ হয়ে যায়, সে মানুষটার জন্য ওর কষ্ট হতে থাকে। তাই শুনে অনন্ত প্রচণ্ড অবাক হয়েছে, ও নাকি  কখনো কারো কাছ থেকে এরকম কথা আগে শোনেনি। অনন্ত অনেকক্ষণ হাসলো, তার হাসি থামছেই না। অনন্ত সুস্মিতাকে বললো বিষয়টা ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে, সেই মানুষের জন্য কষ্ট কেন হবে তা ওর মাথায় ঢুকছে না।     

সুস্মিতা অনন্তকে বোঝানোর চেষ্টা করে, বলে, “আমাকে তো অনেকেই বলেছে তাদের ভালোবাসার কথা, আমাকে তারা জীবন সঙ্গী হিসেবে পেতে চায়, প্রচণ্ড ভালোবাসে আমাকে। কিন্তু আমিতো সবার প্রস্তাবে রাজি হতে পারবো না। যাকে আমিও চাই, শুধুমাত্র তার প্রস্তাবেই সাড়া দিতে পারবো। সেক্ষেত্রে বাকীরা মনে কষ্ট পাবে। তাদের কষ্ট আমি কিভাবে দূর করবো, সেটাতো সম্ভব না। কিন্তু আমি মানুষকে অনেক অনেক ভালোবাসি, কাউকে কখনো কোন কারণে কষ্ট দিতে আমি চাই না। তাই যখনি কেউ আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়, আমার খুবই মন খারাপ হয়, সে যদি অন্য কাউকে চাইতো, যে তাকেই চায়, তাহলে তো আর তার মনে আঘাত লাগতো না।”     

সুস্মিতা বলে, মানুষকে সত্যিকারের ভালোবাসলে অনিচ্ছাকৃত তাকে কষ্ট দিলেও খারাপ লাগে। যদিও ওর ভাই বলেছে, একা একজন কখনোই অন্য সবাইকে সুখী করতে পারে না। তবুও সুস্মিতার ভেতরে অবচেতনেও কাজ করে অন্য সবাইকে সুখী করার চিন্তা। হাসিখুশি মানুষকে কত ভালো লাগে দেখতে, কিন্তু পৃথিবীতে কত কত সমস্যা, কত কারণেই না সেই হাসিমুখ মলিন হয়ে যায়। সুস্মিতা কিভাবে একা সব সমস্যা দূর করবে!   

অনন্ত এগুলো শুনেও হাসে, “তাই বলে প্রেমের প্রস্তাবেও মন খারাপ হবে! কেউ ভুল মানুষকে ভালোবাসলে আমার কী! আমি তো তাকে বলিনি ভালোবাসতে।” সুস্মিতা বলে, “তোরা  ছেলেরা কিভাবে ভাবিস, কিংবা অন্য কোন মেয়ে এটাকে কিভাবে ভাবে তা তো জানিনা, আমি আমার ভাবনাটা বললাম ।”

অনন্ত আবার হেসে বলে, বেশি ভালোবাসলেই বুঝি কষ্ট!

সুস্মিতার ভাই এসে তাড়া দেয়, “গোছগাছ শুরু করো, আস্তে ধীরে রওনা দেই, শেষে হুড়োহুড়ি পড়ে যাবে।”

সুস্মিতা ভেতরে চলে যায়, ব্যাগ গোছাতে।

ফেরার যাত্রায় শুধুই সুস্মিতা আর ওর ভাই। ওদের সাথে অনন্তর ও থাকার কথা ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নাকি সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে, ওর বাড়ি সিলেটেই, সে ওখানে চলে যাচ্ছে। কখন কি হলো, সুস্মিতা কিছুই জানে না, ও তার রুমে ছিল। এর মাঝে যখন বের হবার সময় তখন শুনলো, অনন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। সেই থেকে ওর মনটা খারাপ হয়ে আছে।       

ট্রেনের ঝিঁকঝিঁক শব্দ শুনতে শুনতে সুস্মিতা সিলেটের হারিয়ে যাওয়া দেখছে জানালা দিয়ে, ছোট ছোট সবুজ পাহাড়, দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের ক্ষেত সব হারিয়ে যাচ্ছে। পেছনে ফেলে যাচ্ছে গত কদিনের প্রাণোচ্ছল সময়গুলো।

সুস্মিতার বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে ওর ভাই বলে, “এটাই পৃথিবীর নিয়ম, সবকিছুর মাঝে সবসময় তুমি থাকতে পারবে না, পারবে না ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখতে। ছেড়ে যেতে হয়, ছেড়ে দিতে হয়। পৃথিবীকে, মানুষকে ভালোবাসলে কষ্ট পেতেই হয়।”     

ধীরে ধীরে মাঠ-পাহাড়ের দৃশ্য ঝাপসা হয়ে ওঠে সুস্মিতার চোখের জলে।

আপনার মন্তব্য