আজ রবিবার, , ২১ জানুয়ারী ২০১৮ ইং

‘আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি’

 প্রকাশিত: ২০১৭-১১-২৭ ২৩:৩৫:০০

 আপডেট: ২০১৭-১১-২৭ ২৩:৫৪:৩৭

উজ্জ্বল দাস:

উপমহাদেশের বরেণ্য সংস্কৃতিজন গোপাল দত্ত। শৈশব থেকেই উনার সৃষ্টি আর রূপায়নের প্রেমে মত্ত মাতোয়ারা আমি। দিদি দাদাদের মুখে যখন শুনতাম-
'নাম ধরে আর ডেকো না
প্রেমের সুরভি ভারে
ভীরু পায়ে অভিসারে
কাছে এসো না।'
পরবর্তীতে ভালো লাগাটা মাত্রা ছাড়িয়ে যায় যখন শুনেছিলাম,  গোপাল দত্ত আমাদের বাসায় বসেই গানটি আমার রাঙা আর বড়দাকে শিখিয়েছিলেন। গোপাল দত্তের সাথে এরকমেরই একটি আত্মিক সম্পর্ক ছিলো আমাদের পারিবারিক মিলনমেলায়।

মান্না দের সাথে আরক্তিম ভালোবাসায় যেমন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে জন্মের এক সখ্যতা গড়ে উঠে। তেমনি গোপালদত্তের মাধ্যমেই বারী সিদ্দিকীর সাথে একটা হার্দিক, একটা বিনিসুতোর মালায় এক দৃশ্যমান বন্ধনে গাঁথা পড়ে যায় বারী সিদ্দিকীর গানের জগত।

১৯৫৪ সালের নভেম্বর মাসে বারী সিদ্দিকীর জন্ম হয় ময়মনসিংহ জেলার তৎকালীন নেত্রকোনা শহরে। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে বারী সিদ্দিকীই ছিলেন সবার ছোট। ছোটবেলায় বয়স যখন তিন কিংবা চার হবে, সেই বয়সেই মা’র কাছে তাঁর প্রথম শুনা গান ছিলো ‘শাশুড়িরেও কইয়ো গিয়া’।

সেই গানের সুরই বারী’র মনে গেঁথে যায় সংগীতের প্রতি অনুরক্ততা।  

ছাত্রজীবনেই বারী সিদ্দিকী গানের পাশাপাশি পড়াশুনায়ও বেশ দাপুটে মেধাবী ছিলেন। বিশেষ করে ইংরেজি ছিলো তাঁর প্রিয় বিষয়।

স্কুল-কলেজে পড়ার সময়ে ইংরেজিতে তিনি সকল সময়েই সর্বোচ্চ নম্বর পেতেন। তাঁর দুই সহপাঠী নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সভাপতি অধ্যাপক কামরুজ্জামান চৌধুরী ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী গোলাম মোহাম্মদ খান পাঠান বিমল, উনাদের ভাষ্যমতে, ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর একসঙ্গে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেছেন তাঁরা। ১৯৭৯ সালে শহরের মোক্তারপাড়া এলাকায় আঞ্জুমান আদর্শ সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান শাখায় এসএসসি ও সাতপাই এলাকায় নেত্রকোনা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এ সময় বারী তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ইংরেজি জানতেন এবং পরীক্ষায় ইংরেজিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেতেন। কখনো ৮৫ নম্বরের নিচে পেতেন না। ফলে তাঁর সহপাঠী ও ওপরের ক্লাসের অনেকেই বারীর কাছে ইংরেজি পড়তেন। বারী সিদ্দিকী পড়াশোনা করেছেন নেত্রকোনায় আঞ্জুমান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও নেত্রকোনা সরকারি কলেজে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস বিষয়েও স্নাতক ডিগ্রীলাভ করেন।

১২ বছর বয়সেই নেত্রকোনার শিল্পী পণ্ডিতপ্রবর ব্যক্তিত্ব গোপাল দত্তের অধীনে তার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। বারী সিদ্দিকী মূলত: গ্রামীণ লোকসংগীত ও আধ্যাত্মিক ধারার গানের শিল্পী ছিলেন। তবে একাধারে তিনি খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী, গীতিকার এবং একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত বংশীবাদক। আমরা প্রায়ই শিল্পীকে উনার গানের ফাঁকফোকরে বাঁশী বাজাতেও দেখতাম। বাঁশীর মোহময় মূর্ছনায় ঐন্দ্রজালিক ছোঁয়ায় সম্মোহিত না হয়ে স্থির হয়ে বসে থাকা বড্ড কষ্টকর বড্ড যন্ত্রণাময়, তাই স্থিরচিত্তে উনার ঐন্দ্রজালিক বোনা দেখতাম।

তিনি ওস্তাদ আমিনুর রহমান, দবির খান, পান্নালাল ঘোষ(কিংবদন্তী তুল্য শ্যামাসংগীত শিল্পী) সহ অসংখ্য গুণীশিল্পীর সরাসরি সান্নিধ্য লাভ করেন।

ওস্তাদ আমিনুর রহমান একটি কনসার্টের সময় বারি সিদ্দিকীকে অবলোকন করেন এবং তাকে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন। পরবর্তী ছয় বছর ধরে তিনি ওস্তাদ আমিনুর রহমানের অধীনে প্রশিক্ষণ নেন। সত্তরের দশকে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাথে যুক্ত হন।

আধ্যাত্মবাদ ভাবধারানুসারী হলেও উচ্চাঙ্গ ধারার প্রতিও তাঁর তীব্র আকর্ষণ তাঁকে সেই ধারায়ও ধাবিত করার প্রেরণা দেয়। ওস্তাদ গোপাল দত্তের পরামর্শেই  এবং সিদ্ধান্তেই ক্লাসিক্যাল বা উচ্চাঙ্গ মিউজিক এর উপর পড়াশোনা শুরু করেন। এবং একই সময়ে বাঁশির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন ও বাঁশির ওপর উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে প্রশিক্ষণ নেন।

নব্বইয়ের দশকে ভারতের পুনে গিয়ে পণ্ডিত ভিজি কার্নাডের কাছে তালিম নেন। দেশে ফিরে এসে লোকগীতির সাথে ক্লাসিক মিউজিকের সম্মিলনে গান গাওয়া শুরু করেন।

কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের প্রেরণায় নব্বইয়ের দশকে সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করেন এবং অল্পদিনেই তাঁর সহজাত বিরহ-বিচ্ছেদের মর্মভেদী গনের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন। অধুনা বিলুপ্ত একটি সংবাদপত্রকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বারী সিদ্দিকী বলেন, " হুমায়ূন আহমেদ আমার গাওয়ার পেছনে যথেষ্ট উৎসাহ দিয়েছিলেন। মূলত: তার সাহস নিয়েই সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পেয়েছি।"

এটিই তো একজন জাত গুণীর সম্মান।

১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে বারী সিদ্দিকী প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘রঙের বাড়ই’ নামের একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে জনসমক্ষে প্রথম সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এরপর ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ূন আহমেদের রচনা ও পরিচালনায় নির্মিত শ্রাবণ মেঘের দিন চলচ্চিত্রে ৭টি গানে কণ্ঠ দেন। এর মধ্যে "শুয়া চান পাখি" সহ অনেক গানই শ্রোতাদের মনে চিরস্থায়ী রূপ নেয়, এবং বারী সিদ্দিকীকে আপামর শ্রোতা অন্তরে লালন করে নেন। গানগুলোর জন্য তিনি অতিদ্রুত ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

উল্লেখ্য, ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে জেনেভায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাঁশি সম্মেলনে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অংশগ্রহণ করেন।  জেনেভায় অনুষ্ঠিত  বিশ্ব বাঁশি সম্মেলনে ভারতীয় উপমহাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন বারী সিদ্দিকী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৪৫ মিনিট বাঁশি বাজিয়েছিলেন তিনি। ওই সময়ের কিছু ঘটনা বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) এক অনুষ্ঠানে বর্ণনাও করেছিলেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পারিশ্রমিকের অঙ্ক দেখে চমকে যাওয়া।

অনুষ্ঠান শেষে রাতে যখন পারিশ্রমিকের কাগজে সাক্ষর করতে বলা হয়, বারী সিদ্দিকী ও তার স্ত্রী বিব্রত হন এই ভেবে যে, কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে কি না..! মাত্র ৪৫ মিনিটের অনুষ্ঠানের জন্য তাকে দেওয়া হয়েছিল আট লাখ সাতাশি হাজার টাকা! তার স্ত্রী বলেও বসেন- আয়োজকদের ডেকে বলতে তাদের কোথাও ভুল হয়েছে, তিনি এত টাকা পাওয়ার যোগ্য নন!

বারী সিদ্দিকীর মতে, আয়োজকদের ভুল হওয়ার কথা না। পরদিন তার জন্য নিযুক্ত দোভাষীকে জিজ্ঞাসা করেন, আমার পারিশ্রমিকের অঙ্ক, স্বাক্ষর সব ঠিক আছে তো? দোভাষী জানান, সবকিছু ঠিক আছে।

বারী সিদ্দিকী আরও জানান, তাকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল হোটেলের সেই রুমটায় যেখানে বিখ্যাত ভারতীয় বংশী বাদক পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া জেনেভায় গিয়ে নিয়মিত থাকতেন। তাঁর শিল্পীমনের এই ঔদার্য তাঁকে ছাপিয়ে রাখবে অনন্তকাল অযুত বর্ষ ব্যাপি।

অভিনেতা হিসেবেও তিনি বেশ দুরন্ত ছিলেন।

২০১৩ খ্রিস্টাব্দে সিদ্দিকী ফেরারি অমিতের রচনা ও পরিচালনায় 'পাগলা ঘোড়া' নাটকে প্রথমবারের মত অভিনয় করেন, এবং সাড়া ফেলেন। পরবর্তীতে তাঁকে  শাহনেওয়াজের "মাটির পিঞ্জিরা" নামক চলচ্চিত্রেও অভিনয় করতে দেখা যায়। প্লেব্যাক সিংগারের পাশাপাশি তিনি ছবির জন্য গানও লিখেন অসংখ্য।

শিল্পীর প্রকাশিত গানের অ্যালবামসমূহ:--

একক অ্যালবাম-
দুঃখ রইলো মনে
সরলা
ভাবের দেশে চলো
সাদা রুমাল
মাটির মালিকানা
মাটির দেহ
মনে বড় জ্বালা
প্রেমের উৎসব
ভালোবাসার বসত বাড়ি
লিলুয়া বাতাস
অপরাধী হইলেও আমি তোর
দুঃখ দিলে দুঃখ পাবি

মিশ্র অ্যালবাম
আসমান সাক্ষী (২০০৯)
চন্দ্রদেবী (২০০৯)
চলচ্চিত্র
শ্রাবণ মেঘের দিন (২০০০)
রূপকথার গল্প (২০০৭)
নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ (২০১২)
ও আমার দেশের মাটি (২০১২)
মাটির পিঞ্জিরা (২০১৩)


যেসব গানের জন্য বারী সিদ্দিকী আমাদের মনের দরজায় সতত করাঘাত করে যাবেন, সেগুলো হলো--

'শুয়া চান পাখী'
'আমি একটি জিন্দা লাশ'
আমার মন্দ স্বভাব জেনেও
'আমার গায়ে যত দু:খ সয়'
'প্রেমে পড়াই প্রেমের ধর্ম
'অপরাধী হইলেও আমি'
'রজনী হইস না অবসান'
কত দাগ লাগাইলি প্রাণে
'ভাবের দেশে চলোরে মন'
'নষ্ট জীবন দিয়ে'
'তুমি থাকো কারাগারে'
'দু:খ দিলি দু:খ পাবি'
'ভালোবাসার জ্বালা'
‘আস্ট আঙ্গুল বাঁশের বাঁশি'।
এরকম বহু গানের সার্থক স্রষ্টা তিনি।

"শুয়া চানপাখি" গানটি পরিবেশনের সময় শিল্পী বারী সিদ্দিকী, অকপটে স্বীকার করেন যে, গানটি উকিল মুন্সী বাউল রশিদ উদ্দীনকে সাথে নিয়ে মৃত স্বীয় স্ত্রীকে কবরে নামানোর ঠিক আগ মূহুর্তে স্ত্রীকে কোলে তুলে উকিল মুন্সী গানটি রচনা এবং সুর করে গেয়ে উঠেন। হ্যাঁ এটিই আকাশসম শিল্পী সত্ত্বার বিশাল মনের উদারতা। উকিল মুন্সীই বারী সিদ্দিকীর শিল্পী জীবনসহ প্রাত্যহিক জীবনে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেন।

২০১৭ সালের ১৭ নভেম্বর রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে ঢাকায় স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাঁকে সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। ২৪ নভেম্বর তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। যে নভেম্বর মাসে তাঁর ঘটা করে আগমন সেই নভেম্বর মাসেই তাঁর বিদায়ের সানাই বেজে উঠে।

থেমে যায় একজন নিভৃতচারী সুগায়ক বন্ধুবৎসল অমায়িক, অপ্রতিরোধ্য অজেয় বারী সিদ্দিকীর জীবন প্রদীপ। বাংলা নামক ভূখণ্ডে লেগে থাকবে তাঁর বাঁশীর যাদুময়তা, ঔজ্জ্বল্য ছড়াবে রজনীর অন্ধকার ভেদ করে আলোর প্রখরতা..!

নেত্রকোনা শহরের পৈতৃক বাড়িতেই মরমী এই শিল্পী, ২৫০ শতক জমির ওপর গড়ে তোলেন ‘আশ্রম’ নামে ‘বাউল বাড়ি’। তিনি শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে এই আশ্রম গড়েছিলেন এজন্য যে, এই আশ্রমের ভেতরেই গ্রামের ছোট্ট ছেলেমেয়েরা থাকবে, সংগীত চর্চা করবে, খেলাধুলা করবে, শিশু-কিশোর বান্ধব পরিবেশে তারা বড় হবে। এদের মাঝেই তিনি অনন্তের স্বাদ খুঁজে পেয়েছিলেন।

এ কারণেই তিনি তাঁর ছেলে সাব্বির সিদ্দিকীকে বলে গেছেন তাঁর শেষ ইচ্ছার কথা। মৃত্যুর পর এই ‘বাউল বাড়িতেই’ যেন তাঁকে সমাহিত করা হয়। হয়েছেও তাই।

"প্রবাস প্রজন্ম জাপান সম্মাননা" (২০১৪) সালে এই শিল্পীকে পুরস্কৃত ও সম্মাননা প্রদান করে। এছাড়া শিল্পীর ভাগ্যে খুব বেশি একটা সম্মাননা জুটেনি, শুধু দর্শকদের হৃদয়ছেঁড়া ভালোবাসা ছাড়া। তাই রাষ্ট্রের, এই শিল্পীর প্রতি সম্মানন জানানো আজ সময়ের দাবী, হোক না, তা মরণোত্তরই।

হে গুণী--" রজনী হইস না অবসান"
আমিও চাইনি অবসান হতে, অবসান হলে যে আপনিও...!
প্রণাম গুণীজন, আরক্তিম ভালোবাসায় হৃদয়ের শ্রদ্ধায়...!!

এরপর এখানকার কারলি গ্রামের ‘বাউল বাড়ি’তে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন বাঁশি ও কণ্ঠের মাদকতায় মুগ্ধতা ছড়ানো বারী সিদ্দিকী।

লেখক: প্রভাষক, মদনমোহন কলেজ, সিলেট।

আপনার মন্তব্য