আজ বৃহস্পতিবার, , ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৮ জানুয়ারী, ২০১৭ ০২:২১

সিলেটে বাড়ছে ফ্ল্যাট বিক্রির নামে প্রতারণা

ছবি : প্রতীকী

সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম চৌধুরী। অবসরের পর জমানো টাকা দিয়ে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নগরীর জিন্দাবাজারে বড় ভূইয়া নাসরিন গার্ডেনে একটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন তিনি। চার মাসের মধ্যে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা বুঝে পাননি। এরই মধ্যে ফ্ল্যাটের কাজ শেষ না করে টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান। শুধু ড. নজরুল ইসলামই নন, তার মতো অনেকেই সিলেটে ফ্ল্যাট কিনে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেয়া, অগ্রিম টাকা নিয়ে ফ্ল্যাটের কাজ শেষ না করেই আত্মগোপন করা, একই ফ্ল্যাট একাধিক গ্রাহকের কাছে বিক্রিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

নগরীর উপশহরের মাল্টিপ্ল্যান গ্রুপের শাহজালাল ম্যাল্টিপ্ল্যান সিটিতে একটি ফ্ল্যাট ও দোকানের জন্য ২০০৫ সালে টাকা জমা দিয়েছিলেন প্রবাসী আব্দুর রহমান। কিন্তু আজ পর্যন্ত ফ্ল্যাট বুঝে পাননি। এ নিয়ে সম্প্রতি তিনি সিলেট আদালতে মামলা করলে মাল্টিপ্ল্যান গ্রুপের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।

সিলেটের আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন সিলেট অ্যাপার্টমেন্ট অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট গ্রুপের (সারেগ) সভাপতি হাসিন আহমদ চৌধুরী বলেন, আমাদের সংগঠনের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ উঠলে আমরা তা খতিয়ে দেখি। কিন্তু অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান যদি আমাদের সদস্য না হয়, তখন আমাদের কিছু করার থাকে না। ফ্ল্যাট কেনার আগে ও টাকা দেয়ার আগে ক্রেতাদেরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ফ্ল্যাট বিক্রির নামে সবচেয়ে বড় প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে ভূইয়া প্রপার্টিজ নামে একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটি সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে তিনটি বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট গড়ে তুলেছে। তিনটি অ্যাপার্টমেন্টেই প্লট কিনে প্রতারণার শিকার হয়েছেন গ্রাহকরা। তাই ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তারা থানা ও আদালতে একাধিক মামলা করেছেন। মামলার পর থেকে আত্মগোপনে আছেন ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

সিলেট মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, আমি বড় ভূইয়া নাসরিন গার্ডেনে ফ্ল্যাট কিনেছিলাম। এ অ্যাপার্টমেন্টের মোট ১৯টি ফ্ল্যাট বিক্রি করা হয়েছে ২৫ জনের কাছে। এক ফ্ল্যাট একাধিক ব্যক্তির কাছেও বিক্রি করা হয়েছে। তবে কেউই ফ্ল্যাট বুঝে পাননি। ১৪ তলা অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের কথা বলে আমাদের কাছ থেকে ৭ কোটি টাকা নিয়েছিলেন ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. নাহিদ নজরুল ইসলাম। কিন্তু ভবনের কাজ শেষ না করেই আত্মগোপনে চলে গেছেন তিনি। এ ঘটনায় সম্প্রতি বড় ভূইয়া প্রপার্টিজের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সিলেট মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে প্রতারণা মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার সময় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণে কোনো ব্যাংকঋণ না নেয়ার কথা বললেও ফ্ল্যাটের বিপরীতে মোটা অংকের ব্যাংকঋণও নেয়া হয়। ব্যাংকঋণ পরিশোধের জন্য এখন গ্রাহকদের চাপ দেয়া হচ্ছে।

এই প্রতিষ্ঠান থেকে ফ্ল্যাট কিনে প্রতারিত হয়েছেন এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সদ্য প্রয়াত প্রক্টর অধ্যাপক জহর লাল দাশও।

জহর লাল দাশের ভাই মদন মোহন কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক জয়ন্ত লাল দাশ বলেন, একটি ফ্ল্যাটের জন্য আমার ভাই প্রায় ৩৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি ফ্ল্যাট তো বুঝে পাননি, উল্টো শুনতে পান তার ফ্ল্যাট আরেকজনের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি অ্যাপার্টমেন্ট বড় ভূইয়া টাওয়ারের বিরুদ্ধে গত এপ্রিলে  কোতোয়ালি থানায় আরেকটি মামলা করেন আহমদ মুনতাহা নামে এক ব্যক্তি। মামলায় বড় ভূইয়া প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. নাহিদ নজরুল ইসলাম, তার স্ত্রী ডা. নূরজাহান মুনতাশাসহ সাতজনকে আসামি করা হয়।

মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, অ্যাপার্টমেন্টের ১২ ও ১৩ তলার দুটি ফ্ল্যাট বিক্রির কথা বলে আহমদ মুনতাহার কাছ থেকে ৮১ লাখ টাকা নেন ডা. মো. নাহিদ নজরুল। কিন্তু ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেননি। একপর্যায়ে মুনতাহার টাকা ফেরত চাইলে ডা. নাহিদ ১৫ লাখ ও ৫ লাখ টাকার দুটি চেক দেন, যা পরবর্তীতে ডিজঅনার হয়।

এ ব্যাপারে বড় ভূইয়া প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. নাহিদ নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তার সেলফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে ফ্ল্যাট বিক্রি করে হস্তান্তর না করার অভিযোগে এক প্রবাসীর দায়ের করা মামলায় ৮ ডিসেম্বর ম্যাল্টিপ্ল্যান গ্রুপের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মুন্সেফ আলীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।

জানা গেছে, আরব আমিরাত প্রবাসী আব্দুর রহমান ২০০৫ সালে দুই কিস্তিতে নগরীর উপশহরের শাহজালাল মাল্টিপ্ল্যান সিটিতে একটি ফ্ল্যাট ও দোকানের জন্য ৪১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেন। তিন মাসের মধ্যে তাকে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তিনি তা বুঝে পাননি। এ নিয়ে গত নভেম্বরে আদালতে মামলা করলে আদালত তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিআইবি) নির্দেশ দেন। পিআইবির তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে গত ৮ নভেম্বর সিলেট অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম হুমে সরাবন তহুরা ইঞ্জিনিয়ার মুন্সেফ আলীর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেন।

প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করে মাল্টিপ্ল্যান সিটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মুন্সেফ আলী বলেন, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এমন অভিযোগ ওঠানো হচ্ছে। কী প্রতারণা করেছি, তা আমি নিজেই জানি না।

নগরীর রিকাবীবাজারের একাধিক ফ্ল্যাট দুবার বিক্রির অভিযোগ ওঠেছে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেড ও সিলেট মার্ট প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মামলা করেছেন দুজন ভুক্তভোগী। সম্প্রতি ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট বিক্রির পর দলিলাদি হস্তান্তরের সময় প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ে।

ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যক্ষ তৌহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে গত ২ নভেম্বর সিলেট মহানগর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে মামলা করেন। ১৫ নভেম্বর আব্বাস আলী নামের আরেক প্রতারিত ব্যক্তিও একই আদালতে মামলা করেন। দুটি মামলায় একই ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত দুই আবাসন কোম্পানির বিরুদ্ধে একই ফ্ল্যাট একাধিকবার বিক্রির অভিযোগ করা হয়। মামলা দুটিতে দুই আবাসন কোম্পানিরই চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা সিরাজুল ইসলামসহ নয়জনকে আসামি করা হয়েছে।

তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ এই ভবনের নিচতলায় কলেজ স্থানান্তরের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেন তারা। এ সময় সাড়ে ৪ লাখ টাকার একটি চেক দেয়া হয় ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডকে। সে সময় অনেক ফ্ল্যাট একাধিকবার বিক্রির ঘটনা জানতে  পেরে সেখান থেকে ক্যাম্পাস গুটিয়ে প্রতারণার মামলা করেন তিনি।

একাধিকবার ফ্ল্যাট বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম দাবি করেন, তার দুটি কোম্পানিই বৈধ। একটির পর আরেকটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। অ্যাপার্টমেন্টের ফ্ল্যাট একাধিকবার বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, বিশেষ কারণে তৌহিদুল ইসলামকে তার কলেজ ক্যাম্পাস নিচতলা থেকে তৃতীয় তলায় নিয়ে যেতে বলায় তিনি নানা রকম অভিযোগ করে সরে পড়েন। বিষয়টি আপসে নিষ্পত্তি করতে চাইলে তিনি মোটা অংকের টাকা দাবি করায় আমরা সমাধান করতে পারিনি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত