আজ সোমবার, , ১১ ডিসেম্বর ২০১৭ ইং

শাকিলা ববি, হবিগঞ্জ

১৬ জুন, ২০১৭ ১৪:৪৯

‘দিদিকে বাঁচানোর জন্য আমরা চিৎকার করি, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসে না’

শায়েস্তাগঞ্জে হরিজন সম্প্রদায়ের নারী সুখিয়া রবি দাস হত্যাকাণ্ড

নিহত সুখিয়া রবি দাসের পরিবারের সদস্যরা

"সাইলু রাইত ৩টার সময় আইয়া দুয়ার ধাক্কাইছে খোলার লাইগ্যা। আমরা দুয়ার না খোলায় তাইনে লাত্থি মাইরা দুয়ার খুলছইন। তাইনে কইন আমার বইনজি (বোনের মেয়ে) মনিরে বাইর কইরা দিতাম। আমার বইনে জিকাইছে, হঠাৎ কইরা আমার বইনজি কেরে দিতাম? সাইলুর হাত থেইক্কা বাঁচার লাইগ্যা দিদি আমরারে বাজারো যাওয়ার লিয়াগ্যা কয়।"

কথাগুলো বলেন নিহত সুখিয়া রবি দাসের ছোট বোন সুমা রবি দাশ। সেদিন নিজেদের বাচাঁনোর জন্য সুখিয়ার ছোট বোন সুমা ও বড় বোনের মেয়ে মনি ঘর থেকে বের হয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে।

গত ১০ জুন (শনিবার) সকালে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানার সুতাং বাজারে নারী সুখিয়া রবি দাসকে কাঠ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে আবুল কালাম আজাদ ওরফে সাইলু মিয়া। সুখিয়া রবি দাস হত্যার পর কয়েক ঘন্টার মধ্যে প্রধান আসামি সাইলু মিয়াকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন রাতে অপর আসামি চানপুর গ্রামের শিপন মিয়াকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ছবি: নিহত সুখিয়া রবি দাস

সুখিয়া রবি দাসের বোন সুমা ঘটনার বর্ননা দিয়ে জানান, তারা (সুমা ও মনি) ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সাইলু সুখিয়ার চুল ধরে বাইরে নিয়ে যায়। ঐ সময় সুখিয়া ঘরের দরজার চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে যান। মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর সাইলু সুখিয়ার কোমরে কাঠের টুকরা দিয়ে আঘাত করে। তারপর সুখিয়া প্রাণ বাঁচানোর জন্য বাজারের দিকে দৌড় দেন। সাইলু বাজারে গিয়ে কাঠের টুকরা দিয়ে সুখিয়াকে আঘাত করতে থাকে।
 
সুমা বলেন, আমি আর মনি গাছের আড়াল থেকে দেখি সাইলু দিদিকে মারতে মারতে শরীরের কাপড় খুলে ফেলে। আমার চিৎকার করি দিদিরে বাঁচানোর জন্য, কিন্তু কেউ আসে না। বাজারের পাহাড়াদার এসে লাইট জ্বালিয়ে দেখে আবার চলে যায়। আমরা ২ জন লুকিয়ে সব দেখি, কিন্তু প্রাণের ভয়ে, ইজ্জত যাওয়ার ভয়ে সামনে যেতে পারিনি। ভোর ৫টার দিকে দিদির উলঙ্গ লাশ বাড়িতে নিয়ে আসে সাইলু। সে পাঁচ হাজার টাকা আর একটা মাছ দিয়ে বলে দিদিকে হাসপাতাল নিয়ে যেতে। সাইলু বলে, ওরে (সুখিয়া) মাছ রান্না করে খাওয়ানোর জন্য। আমি বলেছি, তুই আমার দিদিরে মাইরালাইছস, এখন কিভাবে হাসপাতাল নিয়া যাইমু? তারপর আমি দিদির শরীরে ধরে দেখি শরীর ঠান্ডা আর শক্ত হয়ে গেছে। দিদির দম নেই দেখে আমি থানায় যাই আর সাইলু তার বাড়িতে চলে যায়। আমি থানায় বলার পর পুলিশ সাইলুকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে আসে।

সুখিয়া রবি দাসের বোনের মেয়ে মনি রবি দাস বলেন, সুখিয়াকে হত্যা করার ২ দিন আগে ৭ জুন সাইলু, শিপন আর সুজন (স্থানীয় মহিলা ইউপি মেম্বারের ছেলে) বাড়িতে এসে হামলা চালায়। সুজন আমাকে ঘর থেকে বের করার জন্য খুব জোর করে। সুখিয়া মাসি, সুমা মাসি আর আমার মা তাদের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করে। আমাকে বাঁচাতে সুখিয়া মাসি সামনে আসলে সুজন মাসির মাথায় রড দিয়ে আঘাত করে। মাসির মাথায় ৪টি সেলাই লাগে। আমি, মা আর মাসিরা দৌড়ে ঘর ছেড়ে আশ্রয় নেই বাজারের দোকানঘরের বারান্দার নীচে। প্রাণের ভয়ে, ইজ্জতের ভয়ে সারারাত কাটিয়েছি দোকানঘরের বারান্দায়। চিৎকার করে মানুষ ডেকেছি আমাদের বাঁচানোর জন্য। কেউ এগিয়ে আসেনি। আমরা মুচি, নিচু জাত, তাই কেউ আমাদের সাহায্য করে না।

৪/৫ বছর আগে সুখিয়ার স্বামী মনিলাল দাসকেও খুন করে সইলু মিয়া। নিজেদের বসতভিটার জমি দখল করার জন্য প্রতিদিন এভাবে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ এই পরিবারের।

এ ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে আসার পর নিহত সুখিয়া রবি দাশের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট হবিগঞ্জ জেলা শাখা, জেলা কমিউনিস্ট পার্টি, জেলা বাসদ ও জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ সুতাং বাজারে পথসভা, বিক্ষোভ মিছিল এবং মানবন্ধন করে খুনি ও খুনের মদদদাতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টায় থানা প্রাঙ্গনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে শায়েস্তাগঞ্জ থানা পুলিশ। সংবাদ সম্মেলনে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হায়াতুন নবী। তিনি বলেন, সুখিয়া রবি দাস হত্যার পর কয়েক ঘন্টার মধ্যে প্রধান আসামি আবুল কালাম আজাদ ওরফে সাইলু মিয়াকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই আমরা। আর গত রোববার রাতে অপর আসামি চানপুর গ্রামের শিপন মিয়া (৩০) কে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চলছে।

তিনি আরও জানান, সুখিয়া রবি দাস হত্যার বিষয়টি পুলিশ সুপারসহ অন্যান্য উধ্বর্তন কর্মকর্তারা সরেজমিনে তদন্ত ও তদারকি করেছেন। তাঁদের নির্দেশনা মোতাবেক দ্রুত তদন্ত সমাপ্ত করে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত