আজ শুক্রবার, , ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং

হামিদুর রহমান, মাধবপুর

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২৩:০১

দুঃখের সীমা নাই মাধবপুরের বেদে সম্প্রদায়ের

‘ও রানি সেলাম বারে বার,
নামটি আমার জোসনা বানু, রানী, থাকি লক্ষ্যার পার
মোরা এক ঘাটেতে রান্ধি-বাড়ি, আরেক ঘাটে খাই,
মোদের সুখের সীমা নাই।
পথে ঘাটে লোক জমাইয়া মোরা সাপ খেলা দেখাই।’

‘বেদের মেয়ে জোছনা’ চলচ্চিত্রের গানের এই কথাগুলো সিনে-দর্শকদের বিনোদনের খোরাক হলেও বেদে সম্প্রদায়ের জীবন মোটেই আনন্দে ভরপুর নয়। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে সমাজে তাদের আর আগের সুদিন নেই। নেই সেই কদরও। তারা আগের মতো জায়গায় জায়গায় ঘুরে বেড়ান, সাপের খেলাও দেখান। তবে অতীতের মতো সহজে জীবিকা নির্বাহের উপায় আর নেই তাদের। মানুষ এখন আর সাপ খেলা ও তুকতাকে মজে না। বিনোদনের হাজারো আধুনিক বিকল্পের এই যুগে বেদে-বেদেনীদের সনাতনী বিনোদন আকর্ষণ হারিয়েছে।

আজকের দিনে তাই বেদেদের টিকে থাকাই হয়ে পড়েছে কঠিন। সরকারিভাবেও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করায় অতি কষ্টে জীবন যাপন করছে হবিগঞ্জের মাধবপুর পৌর সভার আলাকপুরে বসবাসরত এই সম্প্রদায়ের লোকজন।

জেলার মাধবপুর পৌরসভার আলাকপুর এলাকায় রাস্তার পাশে একটি পরিত্যক্ত মাঠে বসবাসরত বেদেনী সর্দার কামরুনেছা তাদের নানা দুঃখের কাহিনী তুলে ধরলেন। শুধু আর্থিক দুরবস্থাই নয়, সমাজে তারা এক প্রকার অস্পৃশ্য। সমাজের মূলস্রোতের মানুষ তাদের মানুষ বলে গণ্য করে না।

কামরুনেছার অভিযোগ, তাদের ছেলেমেয়েদেরকে স্থানীয় স্কুল-মাদ্রাসায় ভর্তির জন্য নিয়ে গেলেও সেখানে তাদের ভর্তি করতে সমস্যা।

কামরুন নেছার সাথে কথা বলে আরও জানা যায়, উপজেলার কোথাও বিষধর সাপের সন্ধান পেলেই স্থানীয়দের অনুরোধে ছুটে যান তারা। সেখানে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাপ ধরে লোকজনকে বিপদমুক্ত করেন। অথচ মানুষের কাছে নেই তাদের কদর। রাস্তাঘাটে চলাচল করতে সহ্য করতে বিদ্রূপ আর মানুষের হাসি ঠাট্টা। শহরের বিভিন্ন স্থানে ভেষজ ঔষধের মাধ্যমে লোকজনকে চিকিৎসা দেন তারা। কিন্তু বিনিময়ে যা পান তাতে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। লোকে ১০/২০ টাকার বেশি দেয় না। সারাদিনে আয় ১ থেকে দেড়শ টাকা। আর প্রতিটি পরিবারের সদস্য সংখ্যা অন্তত ৫/৬ জন। এ টাকা দিয়ে খাবার যোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয় তাদের। সংসার চালানো খুবই কষ্টকর।

কামরুনেছা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকেও তাদের জীবনমানের উন্নয়নে নেওয়া হচ্ছে না কোনও পদক্ষেপ। এমনকি তাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে ভর্তির জন্য নিয়ে গেলে সেখান থেকেও তাড়িয়ে দেয়া হয়। সামাজিক এসব অন্যায় মুখ বুজে সইতে হয় তাদের। কেউ তাদের পাশে এসে দাঁড়ায় না।

পৌর শহরের আলাকপুর এলাকায় বসবাসরত বেদে সরদার রাজু মিয়া জানান, সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পেটের দায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাপ ধরতে হয় তাদের। বর্তমান বাজারে প্রতিটি সাপের মূল্য ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা হলেও তাদের কাছ থেকে অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা ক্রয় করেন মাত্র ৩ থেকে ৪শ’ টাকা দিয়ে। এতে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর। এই পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তার আবেদন জানান তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এলাকায় প্রায় ১৫টি বেদে পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ৮-১০ টি পরিবার ১০/১২ বছর ধরে ওসব এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে সরকারি জায়গায় কোনও অনুমতি ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন তারা। একারণে স্থানীয় লোকজনও তাদের দেখেন হিংসার চোখে। অনেকেই মনে করেন, বেদে সম্প্রদায়ের লোকদের সাথে মিশলে তাদের ছেলে-মেয়েদের ক্ষতি হবে। এ কারণেও সহ্য করতে হয় হুমকি-ধামকি ও ঠাট্টা-বিদ্রূপ।

এ ব্যাপারে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক মণীষ চাকমা জানান, বেদে সম্প্রদায়ের লোকেরা অনেকটা যাযাবর প্রকৃতির। তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।তিনি হবিগঞ্জে সবেমাত্র যোগদান করেছেন উল্লেখ করে জানান, হবিগঞ্জে কোথায় কোথায় বেদে সম্প্রদায়ের লোকেরা অবস্থান করছে তা তার জানা নেই। শিগগিরই খোঁজ-খবর নিয়ে তাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি নিয়মানুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে জেলা প্রশাসন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত