আজ বৃহস্পতিবার, , ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭ ইং

শাহ শরীফ উদ্দিন

১১ অক্টোবর, ২০১৭ ০১:৪২

বিকট শব্দের মোটরবাইকে অতিষ্ঠ নগরজীবন

মোটর বাইকের বিকট শব্দের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সিলেট নগরবাসী। নগরজুড়ে উচ্চ শব্দে চলাচলকারী মোটরবাইকের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। দলবেঁধে চলাচল করা এসব উচ্চ শব্দের মোটরবাইকের কারণে নগরীর পথচারী ও যাত্রীদের মধ্যে অনেক সময় আতঙ্কও দেখা দেয়।  

অভিযোগ আছে হাইড্রলিক হর্ন ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন পদক্ষেপ নিলেও বিক্রয়কারীদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। ফলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের প্ররোচনায় তরুণরা এসব বিকট শব্দের বাইকে প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। এতে নগরীতে দিনে দিনে বিকট শব্দের বাইকের পরিমাণ বেড়েই চলছে।

বাইক চালকরা হাইড্রলিক হর্নের বিকট শব্দকে শখের বিষয় হিসাবে বিবেচনা করলেও বিশেষজ্ঞরা এটাকে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে মৃত্যুর কারণ হিসেবেই বিবেচনা করছেন।

সিলেট এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক. কান. গলা বিভাগের প্রধান, অধ্যাপক ডা. এন. কে. সিনহা বলেন, মানুষের জীবনে শোনার প্রয়োজন অনেক। কিন্তু শোনার পরিমাণ যদি বেশি হয় তাহলে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। শব্দের পরিমাণ যখন ডেসিবেল ৬০ হয় তখন মানুষ বিরক্ত হয়। এতে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। অপরদিকে শব্দের পরিমাণ যখন ডেসিবেল ৯০ হয় তখন মানুষের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এতে মানুষের উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি হয়। কানের সাথে মস্তিষ্ক সংযোগস্থলে আঘাত আসে। যার ফলে মানুষের স্মৃতি শক্তিতে সমস্যা, শারীরিক নানাবিধ সমস্যা সহ বধির হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বর্তমানে তরুণ ছেলেরা শখের বশে মোটরবাইকে যে বিকট শব্দের সাইলেন্সর ব্যবহার করে এবং হাইড্রলিক হর্ন ব্যবহার করে তা সাধারণত ৯০ ডেসিবলের উপরে হওয়ায় এটা মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ। তাই এসব বিষয়ে এখনই প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রভাত রঞ্জন দে বলেন, এসব শব্দে শিশুরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ শিশুর শব্দধারণ ক্ষমতা বড়দের মতো না থাকায় শিশুরা বধির হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া এসব শব্দে তাদের মস্তিষ্ককে আঘাত আসে। এতে শিশুদের স্মৃতিশক্তি কমে যায়। তাছাড়া শিশুদের মনে স্থায়ি একটি ভয় তৈরি করে। যা শিশুর মানসিক বিকাশে বাধাগ্রস্ত হয়।

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, সিলেট এর সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. আমিনুল ইসলাম লস্কর বলেন, যাদের হৃদরোগজনিত সমস্যা আছে তাদের ক্ষেত্রে এসব শব্দে সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কারণ হঠাত করে এসব বিকট শব্দে হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে আবার কমে যেতে পারে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে স্ট্রোকও হতে পারে।

সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, কিছুক্ষণ পরপরই বিকট শব্দের মোটরবাইক চলাচল করছে। বেশির ভাগ সময় এসব বাইক চালকরা এক সাথে দল বেঁধে বাইক নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ভাবে চালাচ্ছেন। বিভিন্ন দামি ব্র্যান্ডের বাইক চালকরাই এমন শব্দ ছড়াতে দেখা যায় । বিকট শব্দের কারণে আশপাশের মানুষদের মধ্যে আতংকিত দেখা দেয়। বিশেষ করে শিশুরাই বেশি আতংকিত

নগরীর আম্বরখানা এলাকায় মোটরবাইকের উচ্চ শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়া শিশুর মা সামিনা নাসরিন বলেন, আমার মেয়েটাকে নিয়ে স্কুলে যাওয়া আসার সময় প্রায়ই এমন সমস্যার সম্মুখীন হই। এসব শব্দে আমার নিজেরই ভয় লাগে। আর সে তো একটা বাচ্চা। প্রশাসনের লোকদের সামন দিয়েই এমন শব্দ করে বাইক চলে কিন্তু প্রশাসন কিছু বলে না। অন্তত এসব শিশুদের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে হলেও এর একটি সুরাহা করা উচিত।

সামিনা নাসরিনের মতো নগরীর বিভিন্ন জায়গার একাধিক বাসিন্দা এসব বিকট শব্দের বাইকের কারণে এবং শহরের ভিতরে প্রতিযোগিতামূলক বাইক চালকদের কারণে চলাচলে সমস্যার কথা জানিয়ে বলেন, এসব বিকট শব্দের বাইক চলাচল বন্ধ করতে এবং নগরীর ভিতরে বাইক চলাচলে সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করে দেওয়ার দাবি জানান তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায় নগরীর সুবহানি ঘাট, তালতলা, জিন্দাবাজার সহ বেশ কয়েকটি দোকানে সহজেই পাওয়া যায় এসব বিকট শব্দের সাইলেন্সর (ডেকোরেশন) ও হাইড্রলিক হর্ন। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল এর উপর ভিত্তি করে সর্বনিম্ন ১৮ শত টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয় এসব শব্দ উৎপাদনকারী সাইলেন্সর। এমনকি অনলাইনে বিক্রয়কারী এক শ্রেণির বিক্রেতা রয়েছেন। যারা অর্ডার গ্রহণের পর বাসায় পৌঁছে দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিকট শব্দের মোটরবাইক আরোহী বলেন, এসব আসলে সুন্দরের জন্য ব্যবহার করি। যখন বাইক চালাই তখন শব্দ হয়। লোকজন তাকিয়ে থাকে, এমনকি অনেকে সরে রাস্তা দেয়। তাই ভালো লাগে।

কোথায় পাওয়া যায় এবং কতো টাকা দাম এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তালতলা নগর অটোসহ সব কটি বাইক ডেকোরেশন সামগ্রী বিক্রয়কারী দোকানে পাওয়া যায়। দাম সর্ব নিম্ন ১৮০০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। তাছাড়া অনলাইনেও অর্ডার করে আনানো যায়।

এবিষয়ে মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার জেদান আল মুসা (মিডিয়া) বলেন, হাইড্রলিক হর্নের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মহানগর পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। যদিও এই ধরণের সাইলেন্সর নতুন সংযোজন সেহেতু এটার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নেওয়া হলেও শীঘ্রই এই ধরণের বিকট শব্দের সাইলেন্সর ব্যবহারকারী বাইকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, বিষয়টি যেহেতু আমাদের নজরে এসেছে আমরা আলোচনা সাপেক্ষে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত