আজ বৃহস্পতিবার, , ২৩ নভেম্বর ২০১৭ ইং

রাশিদা আক্তার

০৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০১:৩০

কাতালুনিয়া সংকট এবং আমার স্পেন ভ্রমণ আতঙ্ক

ভয় কিংবা ভালোবাসা বেড়ে ওঠে আমাদের মনের গহিনে। কখনও বাস্তবতায় এর বিস্তার বেশি থাকে কখনও কম, কিন্তু আমাদের কল্পনায় আমরা অনেক বড় করে তুলি। এই কথাগুলো ভাবছিলাম বার্সেলোনার পথে হাঁটতে হাঁটতে। কাতালুনিয়া নিয়ে নানা খবর আসছিল পত্রিকার পাতা খুললেই। তাই স্পেন যাওয়া নিয়ে ছিল নানা দ্বিধা দ্বন্দ্ব । কিন্তু আমাকে তো ঝুঁকি নিতেই হবে কারণ আমি ভালোবাসি। ভালোবাসি স্বপ্নের শহর বার্সেলোনা (কাতালুনিয়ার রাজধানী) আর ভালোবাসি মেসিকে।

এত কাছে এসে মেসির ক্লাব না দেখে ফিরে যাব সেটা হতেই পারেনা। আমি খুব খেলার ভক্ত নই, কিন্তু তিনজন খেলোয়াড়কে সব সময়ের জন্য ভাল লেগেছে, ভালোবাসি তাদের ; শচিন টেন্ডুলকার (ক্রিকেটার), হেন্সি ক্রনিজে (ক্রিকেটার: মারা গেছেন বিমান দুর্ঘটনায়) এবং মেসি (ফুটবলার)। কোথায় যেন একটা মিল আছে এই তিন কালজয়ীর ।

সিদ্ধান্ত  নিলাম যাবই স্পেন। কিন্তু পেছনে তাড়া করে ভয় কাতালুনিয়া আন্দোলন এর কারণে। বাসা থেকে ফোন করলেই সতর্ক বাণী, বার্সেলোনা কিন্তু গরম ওখানে যাওয়া বাদ দেয়া যায়না? আমার উত্তর না । যখন কোন বিষয়কে মিডিয়াতে প্রচার করা হয় তখন সেটা আরও বড় হয়ে ওঠে কারণ আমরা নিজের অভিজ্ঞতা, চিন্তা, দলগত আবেগ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি দিয়ে প্রভাবিত হয়ে সে বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাই। তাই যখন আমারা টেলিভিশন এ কাতালুনিয়া সঙ্কট দেখি সেটা আমাদের কাছে অনেক মার কাট একটা বিষয়। এসব শুনে আমার কাতালুনিয়ার সঙ্কটের ঐতিহাসিক  প্রেক্ষাপট জানতে ইচ্ছে হল।

 ১৫শ শতকের শেষদিকে কাতালুনিয়া ছিল  ক্যাস্তিলে আরাগন (Kingdom of Castile ) এর অন্তর্ভুক্ত একটি এলাকা। শুরুর দিকে কাতালুনিয়াসহ আরাগনের অনেক এলাকার নিজস্ব আইন, সামাজিক প্রথা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। একটি অঞ্চল থেকে অপরটি তাদের নিজস্বতা বজায় রেখে চলত। এমনকি ১৬৪০-১৬৫২ সাল পর্যন্ত ফ্রাঞ্চ-স্প্যানিশ (Franco-Spanish War) যুদ্ধের সময় কাতালুনিয়া স্পেনের  হবসবারগ (Habsburg monarchy) রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করে। কিন্তু স্পেন যখন যুদ্ধে সাফল্য লাভ করার সম্ভাবনা দেখা দেয় হবসবারগ এর পক্ষে সমর্থন দেয় কাতালানরা। কারণ  তখন তারা ভয় পায় ফ্রান্স এর সমর্থনকারী দল বুরবন (Bourbon) এর আধিপত্য ও ক্ষমতা বিস্তার কে কাতালুনিয়া অঞ্চলের উপর। এই সময় থেকেই মূলত স্পেন এর কেন্দ্রিয় যে শাসন ব্যবস্থা  তা কাতালুনিয়ার নিজস্ব আঞ্চলিক শাসন কে খর্ব করে। ১৯শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিশেষ করে সাংস্কৃতিক রেনেসাঁর ( নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কৃতি চর্চা ) মূলত কাতালানদের জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীনতা অর্জনের ইচ্ছাকে আবার জাগ্রত করে। ১৮৫০ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে কিছু ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক দল কাতালান স্বাধীনতার  দাবি তোলেন । এর পরের ইতিহাস আমাদের অনেকের ই জানা। আধুনিক কাতালান আন্দোলন আবার শুরু হয় ২০০৬ সাল থেকে “Statue of Autonomy” নিয়ে যা স্পেন সরকার কর্তৃক স্বীকৃত হয় গণভোটের মাধ্যমে কিন্তু বাঁধ সাধে  উচ্চ আদালত । স্প্যানিশ উচ্চ আদালতে দাবি তোলা হয় “Statue of Autonomy” র কিছু অনুচ্ছেদ ছিল অসাংবিধানিক । কিন্তু উচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে গন মানুষের প্রতিবাদ স্বাধীনতা আন্দোলন এ রূপ নেয়। এরপর ২০১০ এবং ২০১১ সালেও কাতালুনিয়াবাসি উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত বদলানোর জন্য প্রতিবাদ করে। ২০১২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কাতালুনিয়ার জাতীয় দিবসে প্রতিবাদ সমাবেশে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করা হয় কাতালুনিয়া স্বাধীনতার জন্য ।

২০১৩ সালে নতুন পার্লামেন্টে কাতালুনিয়ার সার্বভৌমত্ব ঘোষণার বিষয়টি মাথায় রেখে ২০১৪ সালে গণভোটের ঘোষণা  করা হয়। বহু চরাই উতরাই পেরিয়ে সর্বশেষ গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১ অক্টোবর ২০১৭ সালে, যে গণভোটকে কেন্দ্র করে আহত হয় শতাধিক মানুষ । তবে এ গণভোট এনে দেয় কাতালুনিয়ার  স্বাধীনতা  যদিও নতুন করে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের রাজনৈতিক সঙ্কট ।

১ অক্টোবর আমি প্যারিসে, কাতালুনিয়ার গণভোটের খবর দেখছি টেলিভিশনে, বহুলোক আহত হয়েছে। ঠিক দুই দিন পরে আমি যাব বার্সেলোনা। আবার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি, যাব কি যাবনা। কেমন হবে বার্সেলোনা, নিরাপদ হবে কি। আমি একজন বাংলাদেশী এয়ারপোর্ট থেকে যদি আমাকে ফিরিয়ে দেয়। নানা ভাবনা মনে নিয়ে রওয়ানা দিলাম। স্বাভাবিক সময়ের চাইতে বেশি সময় হাতে রাখলাম এয়ারপোর্ট চেক ইন এর জন্য। বাড়তি সতর্কতা লক্ষণীয় ছিল এয়ারপোর্টে। অনেক পুলিশ এর উপস্থিতি ছিল এয়ারপোর্ট  এবং এর আশেপাশের এলাকায়। কখনও কখনও পুলিশ এর দিকে তাকাতে অস্বস্তি লাগত যদি আবার অকারণ সন্দেহ করে, কিছু জিজ্ঞেস করে। যাই হোক ভয় মাথায় নিয়েই চলে গেলাম বার্সেলোনা । গিয়ে দেখলাম শান্ত, চুপচাপ আন্দোলন এর কোন কিছুই তেমন চোখে পড়ল না। বেশ ভালভাবেই ঘুরে বেড়ালাম। যে কদিন কাটালাম কোন  আন্দোলন, কিংবা ঝামেলা চোখে পড়েনি কিন্তু যখন হোস্টেল এর টিভি  রুমে বসতাম তখন আলোচনার ঝড় উঠত বিভিন্ন বিদেশিদের সাথে। শপিং মল কিংবা দোকানগুলোতে মানুষ টুকটাক কথা বলছিল কাতালুনিয়া নিয়ে। যা কল্পনা করে ভয় পাচ্ছিলাম তা ছিল আমার মনের ভয়।

বিশ্বব্যাপী আজ তৈরি হয়েছে ভয়ের সংস্কৃতি। যে ঘটনা আমি দেখিনি তাও তাড়া করে বেড়ায় কারণ আমাদের  ভেতরে তৈরি হয়েছে অজানা ভয়। আমরা সেই ভয়কে  মনের ভেতরে লালন করি, বড় করে তুলি, ছোট করে তুলি। তৈরি হচ্ছে অবিশ্বাস, হাত গুটিয়ে নিচ্ছে বন্ধু। কারণ একটাই ভয়। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের অস্থিরতা, যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংকট  শুধু মনে নয়, পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের  মনস্তত্ত্বে যা আরেক ধরনের সংকটে রূপ লাভ করছে।

  • লেখক: গবেষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত