আজ শুক্রবার, , ২০ অক্টোবর ২০১৭ ইং

ইকবাল মাহমুদ

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০১:১৮

রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণের নামে প্রতারণা

হিউম্যানিটি ফর রোহিঙ্গা’র ব্যানারে সিলেট-টেকনাফ রোডমার্চ। উদ্দেশ্য, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রতিবাদ। পক্ষকাল ধরে ব্যাপক ঢাক-ঢোল পিটিয়ে চলছিলো প্রচারণা। চলেছে অনুদান সংগ্রহ। কোটি টাকার বাজেট হয়েছে।

কর্তৃপক্ষই বলেছে দেশ-বিদেশ থেকে এ অনুদান সংগ্রহ হয়েছে। শরণার্থীদের জন্য ত্রাণ, না রোডমার্চ- কোনটা বেশি জরুরী, এমন প্রশ্নের চেয়ে আরও ভয়ংকর খবর এখন সামনে। সেটি রীতিমত প্রতারণা, ভণ্ডামি। রোডমার্চের জন্য আসা কোটি টাকার অনুদান জায়েজ করতে অভিনব এক কূটকৌশল। এ কৌশলের ধূর্ততার কাছে চাপা পড়েছে মানবিকতা। ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে রচিত হয়েছে এক অধর্মের ঘৃণ্য উপাখ্যান। এ উপাখ্যানের নায়ক ধর্মীয় লেবাসধারী একটি গোষ্ঠী।

রোডমার্চের আগের দিন সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন হিউম্যানিটি ফর রোহিঙ্গা’র চেয়ারম্যান শাহিনূর পাশা চৌধুরী। দাবী করেন, প্রশাসন অনুমোদন দিয়েছে রোডমার্চের। দুই শতাধিক গাড়ি থাকবে বহরে। খরচ হবে কোটি টাকার ওপরে।

বৃহস্পতিবার নির্ধারিত স্থান হুমায়ূন রশীদ চত্বর থেকে ৬৮টি গাড়ির বহর নিয়ে শুরু হয় রোডমার্চ। কয়েক কিলোমিটারের মাথায় রশিদপুর যাওয়ার আগেই রোডমার্চ থামিয়ে দেয় পুলিশ। পুলিশের বক্তব্য, রোডমার্চের কোন প্রশাসনিক অনুমোদন নেয়া হয়নি। ত্রাণ বিতরণের জন্য নেয়া হয়েছে অনুমোদন। এত গাড়ি, এত মানুষ; কিন্তু ত্রাণ কই? খোঁজা শুরু হলো। ৬৮টি গাড়ির মধ্যে ৬৭টিতেই শুধু মানুষ, একটি গাড়ির পেছন দিকে পাওয়া গেলো অল্প কিছু ত্রাণের প্যাকেট। পুলিশ সেই গাড়িটি ছেড়ে দেয়। বাকি সবাইকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র জেদান আল মুসা জানিয়েছেন, ত্রাণ বিতরণের কথা বলেই পুলিশের কাছ থেকে অনুমোদন চাওয়া হয়েছিলো। মানবিক কারণে সে অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবারের রোডমার্চের বহরে ত্রাণ ছিলো গৌণ। সঙ্গত কারণেই তা আটকে দেয়া হয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে রোডমার্চের অনুমোদন না পেয়েও অনুমোদন পাওয়ার দাবী কেন করেছিলেন উদ্যোক্তারা? সেখানেও লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর প্রতারণার কৌশল। অনুমোদন না পাওয়ার খবর চাউর হলে সংগৃহিত বিশাল অংকের অনুদানের টাকা ফেরত চাইতে পারেন দাতারা। তাই যেভাবেই হোক একটি রোডমার্চের শো-ডাউন না করলে যে নয়। আর তা করতে পারলেই কোটি টাকা জায়েজ।

সংবাদ সম্মেলনে শাহিনূর পাশা চৌধুরী দাবী করেছিলেন, দুই শতাধিক গাড়ি থাকবে রোডমার্চের বহরে। অথচ, মাত্র ৬৮টি গাড়ি নিয়েই শুরু হয় যাত্রা। দুইশ’ গাড়ির জন্য কোটি টাকার বাজেট হয়েছিলো। তাহলে গাড়ি ৬৮টি কেন? আর বহরে যোগ দেয়া গাড়িগুলোর মান দেখে যে কেউ বুঝতে পারবেন এ ধরনের লক্কড়-ঝক্কর গাড়ি নিয়ে সিলেট-টেকনাফ দুই হাজার কিলোমিটারের (যাওয়া-আসা) সফর সম্ভব নয়।

এর মানে কি? মানে, উদ্যোক্তারা নিজেরাই জানতেন, রোডমার্চ সফল হবে না। তাদেরকে আটকে দেয়া হবে, যেহেতু অনুমোদন নাই। কিন্তু এতদিনে সংগৃহিত টাকা হজম করতে হবে যে। তাই কোন রকম জোড়াতালি দিয়ে কিছু গাড়ি নিয়ে রোডমার্চ শুরুর একটি মহড়া করা তাদের জন্য অনিবার্য ছিলো। হয়েছেও তাই।

আরও মজার তথ্য হলো, রোডমার্চের জন্য যেসব গাড়ি রিজার্ভ করা হয়েছিলো সেগুলোকে টেকনাফ যাওয়ার জন্য রিজার্ভ করা হয়নি। কয়েক ঘণ্টার জন্য তাদের রিজার্ভ করা হয়েছিলো। উদ্যোক্তা সংগঠনের এক কর্মকর্তাই জানিয়েছেন এ তথ্য। তিনি জানান, প্রতিটি গাড়ি ৩৫০০ টাকা করে ভাড়া করা হয়। আর যেসব মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা রোডমার্চে যোগ দিয়েছিলেন তাদেরকে শেরপুর পর্যন্ত যাওয়ার কথা বলে আনা হয়েছে বলেও জানান এই নেতা।

এখন হিসেব করুনতো.. এই ৬৮টি গাড়ির ভাড়া কত হতে পারে? দুই লাখ ৩৮ হাজার টাকা। প্রচার-প্রচারণাসহ সব মিলিয়ে ধরুন আরও দুই লাখ টাকা খরচ। অর্থাৎ পাঁচ লাখের মধ্যেই মামলা খতম। এক কোটি থেকে পাঁচ লাখ বাদ দিলে কত বাকি থাকে? ৯৫ লাখ টাকা।

মাশাআল্লাহ! এমন ইস্যু যদি বছরে দুয়েকবার আসে, তাহলে আগামি নির্বাচনের খরচ যোগাড় হয়ে যাবে অনায়াসেই।

  • ইকবাল মাহমুদ: সাংবাদিক
  • ফেসবুক থেকে

 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত