আজ বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং

ব্লু হোয়েল: শিক্ষিতদের কুসংস্কার দূর করবে কে?

 প্রকাশিত : ২০১৭-১০-১২ ০৯:৫৮:১৮

লেখক : এস এম নাদিম মাহমুদ

আগে একটা সময় ছিল, যখন কুসংস্কার বিশ্বাসী বলতে ‘অশিক্ষিত’ মানুষদের বুঝানো হতো, কিন্তু দিনে দিনে আমার সেই বিশ্বাসটির পরিবর্তন এসেছে। এখন এই দেশে ‘কুসংস্কার’ আর ‘গুজবে’ সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে আমাদের এই শিক্ষিত সমাজ। স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষ করেও এরা নিজেদের বিবেক-বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে অপারগ।

বাংলাদেশের পিছিয়ে যাওয়ার জন্য এই শিক্ষিত গোষ্ঠী বেশি দায়ী। এই গোষ্ঠীর কানের ককলিয়া এতোটাই সেনসিটিভ যে কেউ কোনও বার্তা ছড়িয়ে দিতে বললেই অনায়াসে সেইগুলো বিলি করতে দ্বিধা করে না।

সম্ভবত দুই দশক আগে আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন মাঝে মধ্যে ছোট একটা কাগজ পেতাম। যেখানে উল্লেখ করা হতো, অমুক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখেছেন, ‘ধর্মীয় বাণী সম্পর্কিত’ কাগজটি ৪০ কপি বিলি করলে অনেক ধন-সম্পদের মালিক হবেন। অথবা বলা হতো, যে ব্যক্তি এই কাগজ ৫০ জনকে দেবে না, দুই সপ্তাহ পর তার পরিবারের কেউ মারা যাবে ইত্যাদি। ক্লাসে সেই সময় দেখতাম, যে বন্ধুটি কাগজের অভাবে স্কুলে অংক করেনি, সেই বন্ধুটিও কাগজ কেটে কেটে হাতে লিখে সবাইকে বিলি করতো। এতদিন পরও আমাদের বিশ্বাসের জায়গায় কোনও কমতি নেই। বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার সাথে সাথে আমরা আমাদের বিচার-বুদ্ধি গিলে খেয়ে ফেলছি।

এমন কোনও হুজুগে ঘটনা নেই, যেগুলোর ম্যাসেজ ফেইসবুকে এসেছে, আর তা আমার ফেইসবুকের বন্ধুরা দিতে ভোলেনি। কয়েকদিন আগে ‘ব্লু হোয়েল’ আতঙ্ক নিয়ে বেশ কিছু ম্যাসেজ ইনবক্সে পেয়েছিলাম, যার মধ্যে বলা হয়েছে +917574999093 এই নম্বর থেকে কোনও ফোন আসলে যেন রিসিভ না করি। আর করলেই নাকি এই মরণব্যাধি আমাকে গিলে খাবে!

বিশ্বাস করতে পারছি না, আমাদের প্রজন্মের মনে এই বিষ কারা ঢোকাচ্ছে? আমি নিজে গতকাল অন্তত অর্ধ শতবার এই নম্বরে ফোন দিয়েছি, আর সব সময় বন্ধ পেয়েছি। নম্বর কোড দেখেও তো কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারতো, এটা কোন দেশের নম্বর?
আবার ধরুন, আপনার ফোনে ইন্টারনেট-ই নেই কিংবা জাভা ভার্সন, তাহলে এই স্মার্টফোনের গেইম চলবে? কিংবা কীভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার অ্যাপস স্টোর থেকে গলিয়ে আপনার মোবাইলে আসবে?

আহা, আমাদের শিক্ষিত জাতি! সারাদিন আমরা ফেইসবুকে ডুবে থাকতে পারি, কিন্তু একটা তথ্য যাচাই করার মুরোদ নেই। যে গেইমটি নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত হয়েছে, সেই গেইম নিয়ে গতকাল আমার জাপানি বন্ধুদের সাথে বেশ আলোচনা করেছিলাম। যে দেশটির মানুষ ভিডিও গেইমের জন্য চাকরি ছেড়ে, যারা সারা বিশ্বে ভিডিও গেইম সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা আয় করছে, সেই দেশের মানুষ ‘ব্লু হোয়েল’ চিনলোই না? চিনবেই বা কেমন করে, এই ধরনের হুজুগে বিষয় তো জাপানিদের মাথা খেতে পারবে না। কারণ, ওরা জানে যে গেইমটি সহজে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষকে খাওয়ানো যাবে।

আমি আমার জাপানি বন্ধুকে বললাম, “আচ্ছা, তোমাদের দেশে তো আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। তাহলে তোমরা কেনো এই গেইম খেলে মরছো না?” তখন ও বললো, “নাদিম, আমরা সেপ্পোকো করি, যাকে বলা হয় ‘অনার সুইসাইড’। তার মানে এই না যে এমন বাজে গেইমের জন্য আমাদের আত্মহত্যাকে দূষিত করতে হবে।”

যেহেতু এই গেইম জাপানে চালু হয়নি, সেহেতু এই গেইমে মৃত্যুর প্রশ্নই ওঠে না। শুধু তাই নয়, এই ধরনের গেইম দেশটি ডাউনলোড লিংকেই ব্লকড।

গেইমটি হোক্স। এটা ধরে নিলাম, আপনার দেশের মানুষ কোনও প্রকার কারণ ছাড়াই বিশ্বাস করে, তাহলে যারা বিটিআরসিতে আছেন, তারা কি বোঝেন না, এই আইপি বন্ধ করা দরকার? প্রযুক্তির বিপরীত শব্দের প্রয়োগ রোধ করবে কারা?

গতকাল রাতে আবার নতুন একটা ম্যাসেজ পেলাম ইনবক্সে। এক ছোট বাচ্চা তার বাবার চিকিৎসার জন্য অর্থ যোগাড় করতে একটা ছবি শেয়ার করলে নাকি সে এক টাকা করে পাবে। কে দেবে, কোথায় থেকে আসবে সে টাকা? মার্ক জুকারবার্গ দেবে? হাস্যকর যুক্তি দিয়ে ইনবক্স ভরিয়ে আমাদের বন্ধুরা প্রমাণ করতে চাচ্ছে, তারা অনেক মহৎ।

যে বন্ধুটি ফেইসবুকে কয়েক বছর থাকার পরও কোনোদিন ম্যাসেজ করেনি, সে কিনা আমার ও আমাদের পরিবারের ভালোর জন্য বার্তাগুলো পাঠিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। আহা, বন্ধু আমার!

এই যে গত এক মাস ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নোবেল পুরস্কার নিয়ে প্রচারণা সত্যি বোকামির সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়েছিল। গুজব কত ধরনের হতে পারে, এটা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। নাম সর্বস্ব কিছু অনলাইন পত্রিকা আর ফেইসবুকের প্রচারণায় পেয়ে গেল প্রধানমন্ত্রীর নোবেল পুরস্কার। আপনি এখন পর্যন্ত কোনও পত্রিকা বা ম্যাগাজিন দেখাতে পারবেন না যেখানে নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম এসেছে, এরপর তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন? দেখুন না এই বছরের কথা, যারা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তাদের প্রতিক্রিয়ার কথা। কেউ কি আগে থেকে নোবেল পাওয়ার আশায় বিভোর হয়ে ছিলেন?

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে জাপানের উপন্যাসিক হারুকি মুরাকামির নোবেল জয়ের সম্ভাব্যতা নিয়ে প্রতি বছরই আলোচনা হচ্ছে। কই, তিনি কি তা পেয়েছেন? যেখানে নোবেল কমিটি কঠোরভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে, সেখানে এই বিষয়ে আলোচনা করার মানে হলো- সেটা হারানো।

তবে হ্যাঁ, এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেবল ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট’রা। নোবেল কমিটি মনে হয় এই জায়গাটিতে এসে তাদের আবেগ ধরে রাখতে পারে না। তাই এমনিতেই মার্কিন প্রেসিডেন্টরা নোবেল পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকেন।

আচ্ছা ধরুন, আপনি শেখ হাসিনাকে খুব ভালবাসেন। তার নেতৃত্বকেও ভালবাসেন। আর এই ভালবাসার মানে এই নয় যে তাকে বিশ্ববাসীর কাছে হাসির পাত্র বানাবেন। ফেইসবুকে ‘Nobel prize’ পেইজে যখন থেকে স্ট্যাটাস আপডেট হতে শুরু করেছে, তখন থেকে আমরা বাঙালিরা যে কমেন্টগুলো করেছি, তা কি কেউ পড়েছেন? দেখুন না আমাদের শান্তির পরিচয় কেমন হয়? এইসব অসাড় মন্তব্য দেখে আমি সত্যিই লজ্জিত। আর নোবেল পাওয়া নিয়েও ইনবক্সে ম্যাসেজ কম ছিল না।

শুধু আজ নয়, এর আগেও যে বার্তাগুলো আমি পেয়েছি, যারা আমাকে দিয়েছে, তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ চুকিয়েছেন। আবার এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও আছেন। যে শিক্ষা আমাদের মনের অন্ধকার দূর করতে পারেনি, সেই শিক্ষার আদৌ কি প্রয়োজন আছে? যে শিক্ষা সহজে গুজবকে গিলিয়ে দিতে পারে, সেই শিক্ষার বাধ্যবাধকতা কি খুব জরুরি?

এইভাবে একটা জাতি চলতে পারে না। এই বার্তাগুলো দেখার পর নিজেকে সত্যিই অসহায় লাগে। যে গ্রুপটি একাত্তরে যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ভারত হয়ে যাবে প্রচারণা করেছিল, যে গ্রুপটি চাঁদে তাদের যুদ্ধাপরাধী ব্যক্তিকে কোনও প্রকার ঝামেলা ছাড়াই দেখতে পেয়ে মরার মিছিল তৈরি করে, তারাই বাঁশের দুর্গ তৈরি করে ফেইসবুকে এই প্রোপাগান্ডাগুলো ছড়িয়ে আমাদের জাতির তেরোটা বাজিয়ে ছাড়ছে।

এরা এমনই উর্বর মস্তিষ্কের অধিকারী যে নামকাওয়াস্তে একবার কোনও ইস্যু বিশ্বাসযোগ্য করে প্রচার করতে পারলেই এদের ফায়দা। কারণ, এরা তো অন্ধকারে শিকার করতে বেশি ভালবাসে। গ্রামের অশিক্ষিত মানুষদের পুঁজি করেই এরা টিকে আছে, তাই শিক্ষিত গোষ্ঠীর আগা-মাথা খাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে আছে। সুযোগ পেলেই ‘গুজবের’ হুলিয়া জারি হয়ে যাবে।

হোক্স আমরা গিলে খাই। অনায়াসে আমরা গুজবকে রপ্ত করতে পারি। নাসিরনগরের রসরাজ কিংবা রামুর মতো ঘটনা রুখতে চাই পরিকল্পনা। প্রযুক্তি অনেক আসবে, তবে ক্ষতিকর দিকগুলো রুখবার ক্ষমতা থাকা বাঞ্ছনীয়।

এস এম নাদিম মাহমুদ, জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আতাহার টিটো আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ১৫ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ১৭ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইকরাম উদ্দিন খান চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ২৭ ইয়ামেন এম হক এনামুল হক এনাম ১৯ এমদাদুল হক তুহিন ১৮ এস এম নাদিম মাহমুদ ১২ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩০ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৩ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৬ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৪৮ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ১৭ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ১৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩১ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৪ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ৫৭ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম মুহম্মদ জাফর ইকবাল ৭১ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ৫৩ রাজেশ পাল ১১ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১২ শাশ্বতী বিপ্লব শাহাব উদ্দিন চঞ্চল শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১০ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৪ সাব্বির হোসাইন সাহাদুল সুহেদ সুপ্রীতি ধর সুশান্ত দাস গুপ্ত

ফেসবুক পেইজ

আর্কাইভ