সাহিত্যের আঙিনায় নতুন নেতৃত্ব এবং বর্ষায় রবীন্দ্রনাথের চিরন্তন আবেদন
আন্তর্জাতিক সাহিত্যের দৃশ্যপটে সম্প্রতি এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে গেল। কবিতার বিশ্বজনীন যাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করতে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ‘একাডেমি অফ আমেরিকান পোয়েটস’ তাদের নতুন চ্যান্সেলরদের নাম ঘোষণা করেছে। ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গ্যাব্রিয়েল ক্যালভোকোরেসি এবং কর্নেলিয়াস ইডিকে একাডেমির নতুন চ্যান্সেলর হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বোর্ড অফ চ্যান্সেলরস মূলত ১৫ জন বিশিষ্ট কবির সমন্বয়ে গঠিত একটি পর্ষদ, যারা এই প্রতিষ্ঠানের শৈল্পিক বিষয়াবলি নিয়ে পরামর্শ দেন, বড় বড় সাহিত্য পুরস্কারের বিচারক হিসেবে কাজ করেন এবং কবিতার দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কবিতার নতুন কাণ্ডারি
একাডেমির ২০২৫ সালের বোর্ডের সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন এই দুই নতুন চ্যান্সেলর। নির্বাচক প্যানেলে ছিলেন জেরিকো ব্রাউন, নাটালি ডিয়াজ, নিকি ফিনি, ক্যারোলিন ফোর্চে, অ্যাড লিমন এবং কেভিন ইয়াংয়ের মতো সমসাময়িক সাহিত্যের দিকপালেরা। গ্যাব্রিয়েল ক্যালভোকোরেসি এবং কর্নেলিয়াস ইডি আগামী ছয় বছরের জন্য এই সম্মানজনক পদে দায়িত্ব পালন করবেন। কবিতার এই যে বিশ্বজুড়ে সমাদর এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় কবিতার সেই শাশ্বত শক্তির কথা, যা যুগ যুগ ধরে মানুষের আবেগ আর প্রকৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে আসছে। ঠিক যেমন বাংলা সাহিত্যে বর্ষা ঋতু আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক ও অবিচ্ছেদ্য সত্তা হয়ে উঠেছেন। কবিতার এই বৈশ্বিক আবহে তাই প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠে আসে বিশ্বকবির বর্ষা-বন্দনার কথা।
রবীন্দ্রনাথ ও বর্ষার সখ্য
বাংলা সাহিত্যে বর্ষা মানেই যেন রবীন্দ্রনাথ। এই ঋতু কবিমনকে যতটা দোলা দিয়ে যেত, তা আর অন্য কোনো ঋতুর ক্ষেত্রে হয়তো সেভাবে দেখা যায় না। আষাঢ় আর শ্রাবণ—বর্ষার এই দুই মাসকে নিয়ে তিনি শতাধিক গান ও কবিতা রচনা করেছেন। বর্ষার দিনে মনের অজান্তেই আমাদের ঠোঁটে ভেসে ওঠে, ‘মনে পড়ে সুয়োরানী দুয়োরানীর কথা/ মনে পড়ে অভিমানী কঙ্কাবতীর ব্যথা/… তারি সঙ্গে মনে পড়ে মেঘলা দিনের গান/ বিষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর, নদেয় এলো বান।’ মুখে মুখে প্রচলিত এই ছড়াটি কার লেখা, তা বাঙালি মাত্রই জানে। শিশুতোষ এই ছড়াটি আজও সমান জনপ্রিয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি ১৮৬১ সালের ৭ মে (বাংলা ২৫ বৈশাখ, ১২৬৮ বঙ্গাব্দ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তিনি বৃষ্টিকে ভালোবেসে সৃষ্টি করে গেছেন অসামান্য সব সুর আর ছন্দ। ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট (২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) তিনি মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর সৃষ্টি আজও বর্ষার দিনে বাঙালির নিত্যসঙ্গী।
শৈশব ও সহজ পাঠে বর্ষা
রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ হলেও তাঁর লেখায় শিশুদের জন্য এক অদ্ভুত মায়া জড়িয়ে আছে। তিনি অনেক মিষ্টি ছড়া, কিশোর কবিতা, গল্প, ভ্রমণকাহিনি এবং আত্মজীবনী লিখেছেন, যার মধ্যে শৈশবের স্মৃতিচারণ অন্যতম। বর্ষা নিয়ে তাঁর লেখা ছড়া-কবিতাগুলো এতই সহজ-সরল ভঙ্গিতে লেখা যে, তা শিশুমনে খুব সহজেই গেঁথে যায়। ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি/ আজ আমাদের ছুটি ও ভাই আজ আমাদের ছুটি’—এই গানটি গাওয়া হয়নি এমন শৈশব বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া ভার। বৃষ্টির দিনে এই গান বা কবিতাগুলো আজীবন আমাদের স্মৃতির মণিকোঠায় থেকে যায়।
প্রকৃতির রূপ ও কবির অনুভূতি
রবীন্দ্রনাথ সবসময়ই প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে পেতে চাইতেন। বৃষ্টির দিনে পাখির কিচিরমিচির গান, নদীর কলকল ধ্বনি—সবই কবির মনকে গভীরভাবে আলোড়িত করত। তাঁর ছোঁয়ায় বর্ষা পেয়েছে বহুমাত্রিক রূপ। ‘মেঘদূত’ কবিতায় তিনি মাতাল বর্ষার রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে—‘আজি অন্ধকার দিবা বৃষ্টি ঝরঝর/ দুরন্ত পবন অতি, আক্রমণে তার/ অরণ্য উদ্যতবাহু করে হাহাকার।’ আবার কখনো ‘আষাঢ়’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে/ ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।’ মেঘমল্লারে সারাদিনমান ঝরনার গান বাজার মতোই কবির সৃষ্টি সর্বত্র বিস্তৃত। বর্ষা যে প্রাণী ও গাছপালাদের নতুন প্রাণশক্তি দেয়, তা কবির কবিতায় বারবার উঠে এসেছে। ‘নব তৃণদলে বাদলের ছায়া পড়ে’—এমন পঙক্তিতে তিনি প্রকৃতির সজীবতাকেই তুলে ধরেছেন।
জীবনবোধ ও বর্ষার বাস্তবতা
তবে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বর্ষা কেবল রোমান্টিকতাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, উঠে এসেছে রূঢ় বাস্তবতাও। আকাশে মেঘ জমে, হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে, যা অনেক সময় জনজীবনে বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কৃষিপ্রধান এই দেশে কৃষকের কষ্টের কারণ হয়ে ওঠে অনাহূত বৃষ্টি। ‘সোনার তরী’ কবিতায় কবি বর্ষার সেই চিত্রই এঁকেছেন, যেখানে কৃষকের অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে—‘গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা/ কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা… রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হল সারা/ ভরা নদী ক্ষুরধারা খর-পরশা।’ একদিকে কবিতার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন নেতৃত্বের অভিষেক, অন্যদিকে আমাদের চিরচেনা বর্ষায় রবি ঠাকুরের এই ধ্রুপদী সৃষ্টি—সব মিলিয়ে কবিতা এভাবেই স্থান-কাল-পাত্র ভেদ করে মানুষের হৃদয়ের কথা বলে যায়।