8 জানুয়ারি 2026

শ্রেণিকক্ষ থেকে ভার্চুয়াল জগৎ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দখলে শিক্ষার ভবিষৎ ও নতুন চ্যালেঞ্জ

শিক্ষা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সংযোজন এখন আর কেবল নতুন কোনো টুল বা গ্যাজেট কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিষয়টি এখন পুরো শিক্ষাদান পদ্ধতি, ডেটা বিশ্লেষণ এবং পাঠদানের অগ্রাধিকারগুলো নতুন করে সাজানোর পর্যায়ে চলে গেছে। বহু প্রজন্ম ধরে আমাদের পড়াশোনা শ্রেণিকক্ষ, পাঠ্যবই আর নির্দিষ্ট সিলেবাসের গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানের শিক্ষার্থীরা এই পুরনো নিয়মগুলো পুরোপুরি বদলে ফেলছে। ডিজিটাল এডুকেশন কাউন্সিলের ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৬ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী তাদের পড়াশোনায় এআই ব্যবহার করছে এবং অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত এই প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছে।

বদলে যাওয়া শিক্ষার ধরন ও শিক্ষার্থীদের চাহিদা

জেন-জি এবং এর পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা চায় তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটাও যেন তাদের দৈনন্দিন ডিজিটাল অভিজ্ঞতার মতোই হয়—সংক্ষিপ্ত, দৃশ্যমান, ইন্টারেক্টিভ এবং যখন খুশি তখন পাওয়ার মতো। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের তথ্যমতে, প্রতি ১০ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে ৭ জনই প্রতিদিন ইউটিউব ব্যবহার করে, আর টিকটকের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১০ জনে ৬ জন। এই প্রবণতা কেবল স্কুলেই আটকে নেই, কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত। টেকস্মিথের ২০২৪ সালের মে মাসে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, ৮৩ শতাংশ মানুষ পড়ার চেয়ে ভিডিওর মাধ্যমে তথ্য জানতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

সরকারি নীতিনির্ধারক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই পরিবর্তন একইসাথে জরুরি বার্তা এবং সুযোগ নিয়ে এসেছে। সনাতন পদ্ধতির দীর্ঘ লেকচার বা একঘেয়ে ক্লাস এখন আর শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। এর বদলে খান একাডেমির ‘খানমিগো’র মতো এআই-চালিত টিউটর বা মাইক্রোলার্নিং প্ল্যাটফর্মগুলো শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও গতি অনুযায়ী শিক্ষা দিয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাগুলোতে এখন কেবল একাডেমিক ডিগ্রি নয়, বরং কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে।

প্রযুক্তির অপব্যবহার ও শিক্ষকদের অভিনব প্রতিরোধ

প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা মুদ্রার উল্টো পিঠও দেখছে। এআই ব্যবহার করে অ্যাসাইনমেন্ট বা পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন এখন এতটাই মহামারী আকার ধারণ করেছে যে, অনেক অভিজ্ঞ শিক্ষক ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তবে শিক্ষকরাও হাত গুটিয়ে বসে নেই; তারা চতুরতার সাথে প্রযুক্তির ফাঁদেই নকলকারীদের আটকানোর কৌশল বের করেছেন। কেউ কেউ ফিরে যাচ্ছেন পুরনো পদ্ধতির মৌখিক পরীক্ষা বা ব্লুবুক এক্সামে, আবার কেউ কেউ এআই ব্যবহার করেই ধরছেন এআই ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের।

ইতিহাসের অধ্যাপক উইল টিগ তার একটি আর্টিকেলে উল্লেখ করেছেন, তিনি শিক্ষার্থীদের ফাঁদে ফেলার জন্য অ্যাসাইনমেন্টের নির্দেশনায় ‘লুকানো টেক্সট’ বা হিডেন টেক্সট জুড়ে দিয়েছিলেন। এই লেখাগুলো মানুষের চোখে পড়ে না, কিন্তু চ্যাটজিপিটির মতো এআই টুল সেগুলো পড়তে পারে। তিনি ১৮০০ সালের দাস বিদ্রোহ নিয়ে একটি অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছিলেন, কিন্তু গোপনে এআই-কে ভুল নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন। ফলে যারা এআই ব্যবহার করেছে, তাদের উত্তরে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় চলে এসেছে এবং সহজেই তারা ধরা পড়ে গেছে।

মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ ও এআই শনাক্তকরণ

আরেকজন অধ্যাপক প্রযুক্তির চেয়ে বুদ্ধির জোর খাটিয়েছেন বেশি। তিনি অ্যাসাইনমেন্টের প্রশ্নটি এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যে, কোনো শিক্ষার্থী যদি এআই ব্যবহার করে উত্তর খুঁজতে যায়, তবে সে বিভ্রান্ত হয়ে সাইকোঅ্যানালাইসিস বা মনস্তত্ত্ব নিয়ে লিখবে, যা মূল বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত নয়। তিনি প্রশ্নের মধ্যে ‘সিগমুন্ড’, ‘ডোরা’ এবং ‘কাউচ’ বা সোফার মতো শব্দগুলো সুকৌশলে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই, যারা যন্ত্রের ওপর নির্ভর করেছে, তারা সিগমুন্ড ফ্রয়েডের বিখ্যাত ‘ডোরা’ কেস স্টাডি নিয়ে লিখে জমা দিয়েছে।

এই পদ্ধতির সৌন্দর্য হলো, এখানে শিক্ষকের খুব বেশি প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকার প্রয়োজন নেই। তিনি সরাসরি শিক্ষার্থীকে এআই ব্যবহারের দায়ে অভিযুক্ত না করে, ভুল এবং অপ্রাসঙ্গিক উত্তর লেখার কারণে ‘এফ’ গ্রেড দিচ্ছেন। এতে শিক্ষকের অবস্থানও নৈতিকভাবে শক্ত থাকছে।

নৈতিকতা ও শিক্ষার ন্যায়বিচার

এই ধরনের ‘ফাঁদ’ পাতা কতটা নৈতিক, তা নিয়ে শিক্ষাবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তবে ‘চিট শিট’-এর ডেরেক নিউটনের মতে, শিক্ষার্থীরা যদি পড়াশোনা না করে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে শিক্ষকদের এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া অন্যায্য নয়। শতাব্দী ধরে শিক্ষকরা নকল ধরার বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে আসছেন। এআই শনাক্তকরণ সেই প্রচেষ্টারই আধুনিক রূপ মাত্র।

যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন শিক্ষা বিভাগকে সংকুচিত করার বা ভেঙে ফেলার যে উদ্যোগ নিচ্ছে, সেলেস্ট ফার্নান্দেজের মতে তা শিক্ষার্থীদের সুযোগবঞ্চিত করবে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার মান ও ন্যায়বিচার বজায় রাখা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। শিক্ষকরা যদি এআই-এর অপব্যবহার রোধ করে শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের শেখার পথে ফিরিয়ে আনতে পারেন, তবে তা দিনশেষে শিক্ষার গুণগত মানই নিশ্চিত করবে। নকল করে ধরা পড়াটা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি শিক্ষার সুযোগ হতে পারে—যাতে তারা বুঝতে পারে যে যন্ত্রের ওপর অন্ধ নির্ভরতা নয়, বরং নিজের মেধার বিকাশই আসল উদ্দেশ্য।