28 জানুয়ারি 2026

শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব: ভারতের বাজেট প্রত্যাশা ও চীনের পাঠ্যক্রম সংস্কার

একসময় মনে করা হতো এডটেক বা শিক্ষাপ্রযুক্তি বুঝি কেবল মহামারিকালীন এক সাময়িক সমাধান বা ‘কনভিনিয়েন্স’। কিন্তু সেই ধারণা এখন আমূল বদলে গেছে। স্টার্টআপগুলোর হাত ধরে উঠে আসা এই খাতটি এখন আর কেবল ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ভারতের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান তৈরির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ‘ডিজিটাল-ফার্স্ট’ বা প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ব অর্থনীতির এই যুগে টিকে থাকতে হলে এডটেক এখন অপরিহার্য জাতীয় অবকাঠামো।

বাজেট এবং নীতিমালার পরিবর্তন

গত এক বছরে ভারত সরকারের নীতিতেও এই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। ২০২৫ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ১.২৮ লক্ষ কোটি রুপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল এক বিশাল পদক্ষেপ। এর আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর জন্য ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’ তৈরি, অটল টিঙ্কারিং ল্যাব স্থাপন এবং ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রসারে জোর দেওয়া হয়। এই উদ্যোগগুলোর মূল লক্ষ্যই ছিল ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার যোগসূত্র স্থাপন করা। ব্লেন্ডেড লার্নিং বা মিশ্র শিক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর এই গুরুত্বারোপ শ্রমবাজারে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

তবে ২০২৬ সালের বাজেটকে সামনে রেখে এই খাতের অংশীজনরা বেশ কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরছেন। বিশেষ করে এডটেক কোম্পানিগুলোর ওপর জিএসটি-র বোঝা এবং এআই দক্ষতায় যে বিশাল ঘাটতি বা ‘স্কিল গ্যাপ’ রয়ে গেছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। তাদের মতে, বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এই ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন।

চীনের শ্রেণিকক্ষে এআই বিপ্লব

ভারত যখন নীতিগত পর্যায় ও বাজেটের মাধ্যমে এআই দক্ষতাকে শানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, প্রতিবেশী দেশ চীন তখন সরাসরি স্কুল পর্যায়েই এর বাস্তবায়ন শুরু করেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দক্ষতা বাড়াতে তারা স্কুলের পাঠ্যক্রমেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় তথ্যপ্রযুক্তি ক্লাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এআই কোর্স চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। বেইজিং এবং অন্যান্য জেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে চলতি বছরের শেষ দিক থেকেই এআই বিষয়ে পাঠদান শুরু হবে।

পাঠ্যক্রমের বিন্যাস ও লক্ষ্য

এই পাঠ্যক্রমটি সাজানো হয়েছে শিক্ষার্থীদের বয়সের কথা মাথায় রেখে, যা ধাপে ধাপে তাদের দক্ষ করে তুলবে। তৃতীয় শ্রেণির শিশুরা শিখবে এআই-এর প্রাথমিক বিষয়গুলো। চতুর্থ শ্রেণিতে উঠলেই তারা পরিচিত হবে ডেটা প্রসেসিং এবং কোডিংয়ের সঙ্গে। আর পঞ্চম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা শিখবে ‘ইন্টেলিজেন্ট এজেন্ট’ ও অ্যালগরিদম সম্পর্কে। বেইজিং ইউনিভার্সিটি অফ পোস্টস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনস অ্যাফিলিয়েটেড প্রাইমারি স্কুলের কম্পিউটার শিক্ষক ওয়াং লে মনে করেন, এর মাধ্যমে শিশুরা কেবল প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হবে না, বরং তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্যও প্রস্তুত হবে। এতে চীনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে এবং দক্ষ পেশাজীবীর একটি বিশাল ‘ট্যালেন্ট পুল’ তৈরি হবে।

জাতীয় কৌশল ও প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা

স্কুলে এআই অন্তর্ভুক্ত করা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি আগামী চার বছরের মধ্যে এআই খাতে বিশ্বনেতা হওয়ার জন্য চীনের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি গঠনে এর কোনো বিকল্প নেই। ওয়াং লে জোর দিয়ে বলেন, তাদের এই জাতীয় কৌশলের মূল মন্ত্রই হলো ‘কেজি জিংগুও’ (Keji xingguo), যার অর্থ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করা।

অভিভাবকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

রাষ্ট্রীয় এই উদ্যোগে অভিভাবকদের মধ্যেও নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। লি ইউতিয়ান নামের এক অভিভাবক, যার ছেলে রোবোটিক্স ও কম্পিউটারে আগ্রহী, তিনি এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। ছেলেকে স্বচক্ষে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কাজ দেখাতে তিনি তাকে শাওমি-র কারখানাতেও নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি মনে করেন, এটি সময়ের দাবি। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। অনেক অভিভাবকই আশঙ্কা করছেন, প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শিশুদের নিজস্ব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বা ‘প্রবলেম সলভিং স্কিল’ নষ্ট করে দিতে পারে। তবুও বিশ্বজুড়ে যেখানে ডিজিটাল দক্ষতাই প্রধান চাবিকাঠি হয়ে উঠছে, সেখানে ভারত ও চীন—উভয় দেশই নিজস্ব উপায়ে সেই ভবিষ্যতের দিকেই ধাবিত হচ্ছে।