20 মে 2026

সায়েন্স ফিকশন ও ফ্যান্টাসির রূপান্তর: নিলামের কোটি টাকার রেকর্ড থেকে ২০২৬-এর নতুন ধারার বই

হেরিটেজ অকশনসের ‘ডেভিড অ্যারোনোভিটজ কালেকশন অব ইম্পর্ট্যান্ট সায়েন্স ফিকশন অ্যান্ড ফ্যান্টাসি পার্ট ১’-এর নিলামের খবরটা সারা বিশ্বের বিরল বইয়ের সংগ্রাহকদের রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছে। সেখানে জে. আর. আর. টলকিনের ‘দ্য হবিট’-এর প্রথম সংস্করণের একটি কপি বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার ডলারে। বইটির জ্যাকেটটি এখনো বেশ উজ্জ্বল এবং অবিকৃত অবস্থাতেই আছে, আর এটি টলকিনের যেকোনো বইয়ের নিলামের ইতিহাসে একটি নতুন রেকর্ড। শুধু এই একটি বই-ই নয়, টলকিনের আরও কিছু অমূল্য কাজ এই নিলামে নজর কেড়েছে। যেমন, লেখকের নিজের হাতে সই করা এবং তাঁর হাউসকিপারকে বড়দিনের উপহার হিসেবে দেওয়া ‘দ্য হবিট’-এর একটি বিশেষ কপি বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ডলারে। আর ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’ ট্রিলজির প্রথম সংস্করণের একটি সেট ৩ লাখ ২৫ হাজার ডলারে বিক্রি হয়ে সইবিহীন কপির ক্ষেত্রে নতুন বেঞ্চমার্ক তৈরি করেছে।

ধ্রুপদী সায়েন্স ফিকশনের মহারথীরাও এই নিলামে নিজেদের প্রমাণ করেছেন। রবার্ট এ. হাইনলাইনের ১৯৬১ সালের উপন্যাস ‘স্ট্রেঞ্জার ইন আ স্ট্রেঞ্জ ল্যান্ড’-এর তিনটি ডেডিকেশন কপি, যা রবার্ট করনগ, ফ্রেডেরিক ব্রাউন এবং ফিলিপ হোসে ফার্মারকে উৎসর্গ করা হয়েছিল, সেগুলো একত্রে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৫০ ডলারে বিক্রি হয়েছে। আইজ্যাক আসিমভের বিখ্যাত ‘আই, রোবট’-এর একটি কপি, যেখানে ম্যাগাজিন সম্পাদক জন ডব্লিউ. ক্যাম্পবেল জুনিয়রকে উদ্দেশ্য করে চমৎকার এক বার্তা লেখা ছিল, সেটা ৮৭ হাজার ৫০০ ডলারে কিনে নিয়েছেন এক সংগ্রাহক। আসিমভ সেখানে লিখেছিলেন, “বিশ্বাস করুন, আপনার সাথে হওয়া অসংখ্য উপকারী আলোচনার স্বীকৃতি হিসেবে এই উৎসর্গটুকু একেবারেই যথেষ্ট নয়!” এছাড়া স্টিফেন কিংয়ের ১৯৮০ সালের ‘ফায়ারস্টার্টার’-এর একটি বিশেষ পাবলিশার্স কপি ৭৫ হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছে। অ্যালুমিনিয়ামে মোড়ানো অ্যাসবেসটস ক্লথে বাঁধাই করা এবং মাত্র ২৬টি কপির একটি হওয়ায় এটি বেশ বিরল।

পুরোনো দিনের বইয়ের মধ্যে জুল ভার্নের ‘টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সিজ’-এর আমেরিকান ফার্স্ট এডিশনও চমক দেখিয়েছে ৪০ হাজার ডলার হাঁকিয়ে। এই কপির প্রচ্ছদে ‘সিয়া’ (Sea) বানানে ‘এস’ (s) ছিল না, আর প্রকাশের মাসেই ১৮৭২ সালের গ্রেট বোস্টন ফায়ারে এর বেশির ভাগ কপিই পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় এটি এখন দুষ্প্রাপ্য। এর পাশাপাশি ফিলিপ কে. ডিকের ১৯৬৮ সালের ‘ডু অ্যান্ড্রয়েডস ড্রিম অব ইলেকট্রিক শিপ?’ (৩৭ হাজার ৫০০ ডলার) এবং অ্যালডাস হাক্সলির ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’ (৩২ হাজার ৫০০ ডলার) রেকর্ড গড়েছে। সব মিলিয়ে পুরো সায়েন্স ফিকশন লাইব্রেরিটি বিক্রি হয়েছে ৩৩ লাখ ৫৩ হাজার ৬২৬ ডলারে। এই অভাবনীয় সাফল্যের পর কালেকশনের দ্বিতীয় পর্ব এই বছরের ডিসেম্বরে এবং তৃতীয় পর্ব ২০২৭ সালের বসন্তে নিলামে ওঠার কথা রয়েছে।

ধ্রুপদী বইগুলোর এই আকাশছোঁয়া কদর দেখে একটা ব্যাপার বেশ স্পষ্ট, এই জনরার প্রতি পাঠকদের টান সময়ের সাথে সাথে বেড়েই চলেছে। তবে সাহিত্য তো আর পুরোনো পাতায় আটকে থাকে না, তা প্রতিনিয়ত বদলায়। ২০২৬ সালে এসে ফ্যান্টাসি আর সাই-ফাইয়ের জগৎটা কতটা বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক প্রকাশনাগুলোতে। বিশেষ করে কুইয়ার পাঠকদের জন্য এখন কোজি ফ্যান্টাসি থেকে শুরু করে সাই-ফাই হরর—সব ধরনের স্বাদই হাতের মুঠোয়। বছর শেষ হওয়ার জন্য বসে থাকার কোনো দরকার নেই, ২০২৬ সালের দারুণ কিছু কুইয়ার সায়েন্স ফিকশন ও ফ্যান্টাসি বই এখনই পড়ে ফেলার সুযোগ আছে।

উদাহরণ হিসেবে ইয়েজিন সুহ-এর লেখা ইয়ং অ্যাডাল্ট ফ্যান্টাসি ‘দ্য লাস্ট সোলজার অব নাভা’ বইটির কথা বলা যায়। কোরিয়ান মিথোলজির প্রেক্ষাপটে লেখা এই উপন্যাসের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে রহস্য। গল্পটা এমন এক মেয়েকে ঘিরে, যাকে তার অমর শাসক বাবা ছোটবেলা থেকেই একটা নিখুঁত অস্ত্র হিসেবে বড় করেছে। নিজের অতীত লুকিয়ে মেয়েটি চেয়েছিল আড়ালে একটা সাধারণ জীবন কাটাতে। কিন্তু যখন সে তার বাবারই নতুন এক নির্দয় প্রডিজির হাতে ধরা পড়ে রাজদরবারের কূটচালে আবার জড়িয়ে যায়, তখন সে বুঝতে পারে তার ভেতরের অন্ধকার শক্তি দিয়ে যেমন পৃথিবী ধ্বংস করা যায়, তেমনি চাইলে তাকে বাঁচানোও সম্ভব। এই বইয়ের স্যাপিক রেপ্রিজেন্টেশন মূল প্লটের সাথে বেশ অর্গানিকভাবেই মিশে গেছে।

অন্যদিকে একটু হালকা মেজাজের কিছু পড়তে চাইলে জেসি সিলভার ‘হাউ টু লুজ আ গবলিন ইন টেন ডেজ’ হতে পারে দারুণ এক রিফ্রেশমেন্ট। এটি মূলত একটি কোজি ফ্যান্টাসি রোমান্স, যেখানে মূল চরিত্রটি নন-বাইনারি। একটা পরিত্যক্ত কুটির নিয়ে এক গবলিন আর এক হাফলিংয়ের মধ্যে রীতিমতো স্নায়ুযুদ্ধ দিয়ে গল্পের শুরু। রেন অনেক দিন ধরেই কুটিরটার দেখভাল করছিল, তাই সে স্বভাবতই জায়গাটাকে নিজের মনে করে। কিন্তু প্যান্সি যখন এসে দাবি করে যে তার মৃত দাদি তাকে এই জায়গাটা দিয়ে গেছে, তখন সে চায় ওই গবলিনটা যেন তার সব জঞ্জাল নিয়ে সেখান থেকে বিদেয় হয়। কেউই জায়গা ছাড়তে রাজি নয়, তাই শেষমেশ তাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত চুক্তি হয়—যে আগে হাল ছেড়ে পালাবে, সে কুটিরের ওপর সব অধিকার হারাবে। কিন্তু একে অপরকে ভয় দেখানো বা বিরক্ত করার সব রকম চেষ্টা যখন একে একে ব্যর্থ হতে থাকে, তখন এই দুই ভিন্ন সত্তার মনে একটা প্রশ্ন জাগতেই পারে—একসঙ্গে থাকাটা হয়তো খুব একটা খারাপ কিছু নয়!