শ্রেণীকক্ষে এআই: কেবলই কৌতূহল নাকি শিক্ষার নতুন চালিকাশক্তি?
শিক্ষা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহার এখন আর কোনো দূরের ভবিষ্যৎ নয়, বরং আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। তবে শুধু নতুন প্রযুক্তির ক্লাসরুমে আগমনই শেষ কথা নয়; মূল চ্যালেঞ্জটি হলো—কীভাবে একে অর্থপূর্ণ, কার্যকর এবং দায়িত্বশীল উপায়ে কাজে লাগানো যায়। সম্প্রতি বার্মিংহাম মিউজিয়াম অফ আর্ট এবং বুটওয়েল অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এড ফার্মের ‘ফিউচার অফ লার্নিং সামিট’-এ শিক্ষাবিদ ও প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা যখন সুযোগের অসমতা ও বৈষম্য দূর করার উপায় খুঁজছেন, ঠিক তখনই টেক জায়ান্ট মাইক্রোসফট প্রকাশ করেছে তাদের বার্ষিক ‘এআই ইন এডুকেশন রিপোর্ট ২০২৬’। এই বৈশ্বিক প্রতিবেদন এবং স্থানীয় পর্যায়ের আলোচনা আসলে একটি বড় সত্যেরই জানান দেয়: এআই নিয়ে এখন আর কেবল কৌতূহল বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সময় নেই, একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সময় এসেছে।
মাইক্রোসফটের তৃতীয় বার্ষিক প্রতিবেদনটির দিকে তাকালে বোঝা যায়, শিক্ষাঙ্গনে এআই-এর বিস্তার কতটা দ্রুত ঘটছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী ও শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ৮৮ শতাংশ শিক্ষক ইতিমধ্যেই পড়াশোনা বা প্রাতিষ্ঠানিক কাজে কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করেছেন। প্রায় ৫৮ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এআই সরাসরি চালু করেছে কিংবা এর পরিধি বাড়াচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, গত এক বছরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের মাঝেই এর ব্যবহারের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে—পরিসংখ্যান বলছে, ৭৮ শতাংশ শিক্ষা নেতা, ৭৬ শতাংশ শিক্ষক এবং ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী আগের চেয়ে বেশি এআই ব্যবহার করছেন।
কিন্তু এই দ্রুতগতির আড়ালে একটা বড় শূন্যতাও রয়ে গেছে, আর তা হলো সঠিক দক্ষতার অভাব। প্রায় ৮৭ শতাংশ শিক্ষক এবং ৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, ভবিষ্যতের জন্য এআই-এর সঠিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার জানাটা জরুরি। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, ৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং ৫৩ শতাংশ শিক্ষক এখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণই পাননি! এখানেই শেষ নয়, সিংহভাগ শিক্ষক (৬৬%) ও শিক্ষার্থী (৫২%) চান তাদের প্রতিষ্ঠান যেন অন্তত মাসে বা তিন মাসে একবার হলেও এআই সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।
প্রযুক্তির ভালো দিকের পাশাপাশি এর অপব্যবহারের ভয়টাও কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রায় ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং ৪২ শতাংশ শিক্ষকের প্রধান দুশ্চিন্তার জায়গা হলো ‘অ্যাকাডেমিক সততা’ বা নকলের ভয়। ক্লাসরুমে ঠিক কখন এবং কীভাবে এআই ব্যবহার করা উচিত, তার একটা সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী নির্দেশনার প্রয়োজন এখন সবচেয়ে বেশি।
মাইক্রোসফটের এডুকেশন মার্কেটিংয়ের জেনারেল ম্যানেজার ম্যাট জুবেলিরার বিষয়টি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষকেরা এখন এআই-কে ক্লাসরুমের একজন সহযোগী হিসেবে দেখছেন। প্রশ্ন এখন এটা নয় যে তারা এআই ব্যবহার করবেন কি না, বরং প্রশ্ন হলো কীভাবে এর সেরা ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। মাইক্রোসফট এআই-কে দেখছে শিক্ষার একজন অংশীদার হিসেবে, যা শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা বা ক্রিটিক্যাল থিংকিং বাড়াতে সাহায্য করবে; এটা স্রেফ কোনো ‘উত্তর খোঁজার ইঞ্জিন’ নয় যা শিক্ষার্থীদের অলস বানিয়ে দেবে বা তাদের হয়ে সব কাজ করে দেবে।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই মাইক্রোসফট তাদের ‘৩৬৫ এডুকেশন’ ইকোসিস্টেমে কিছু নতুন ও দারুণ ফিচার নিয়ে এসেছে, যা শিক্ষকেরা প্রতিদিনের ক্লাসে একদম বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারবেন। যেমন, ‘টিচ’ (Teach) প্ল্যাটফর্মের ‘ইউনিট প্ল্যানস’ দিয়ে শিক্ষকেরা মাত্র কয়েক মিনিটে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পুরো ক্লাসের পাঠপরিকল্পনা তৈরি করে ফেলতে পারছেন। আবার অ্যাসাইনমেন্টের ভেতরেই যোগ করা হয়েছে ‘স্টুডেন্ট এআই গাইডলাইন্স’ এবং ‘লার্নিং গ্রুপস’, যা শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেবে ঠিক কতটুকু এআই-এর সাহায্য তারা নিতে পারবে এবং শিক্ষকেরাও শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্যময় প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠ সাজাতে পারবেন। উইন্ডোজ ১১ ব্যবহারকারীদের জন্য ‘লার্নিং জোন’ নামক একটি ইন্টারঅ্যাক্টিভ লাইভ ক্লাসরুমের অভিজ্ঞতাও নিয়ে আসা হয়েছে, যেখানে শিক্ষকেরা সরাসরি শিক্ষার্থীদের কাজের ওপর নজর রাখতে পারবেন।
শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী করে তুলতে ‘কোপাইলট নোটবুকস’ এবং ‘স্টাডি অ্যান্ড লার্ন агент’-এর মতো ফিচারগুলো বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এগুলো শিক্ষার্থীদের পড়ার বিষয়গুলোকে একটি গোছানো ও ইন্টারঅ্যাক্টিভ স্টাডি গাইডে রূপান্তর করে, কিন্তু নিজে থেকে হোমওয়ার্ক করে দেয় না। বরং গাইড হিসেবে রিয়েল-টাইম ফিডব্যাক দেয়, যাতে শিক্ষার্থী নিজেই নিজের পড়াটা বুঝতে পারে।
বিশ্বজুড়ে যখন বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এই টুল তৈরিতে ব্যস্ত, তখন স্থানীয় পর্যায়ে এর প্রয়োগ এবং তার প্রভাব কেমন হচ্ছে, তা বোঝা জরুরি। বার্মিংহামের সামিটটি তারই একটা বড় উদাহরণ। গত পাঁচ বছরে এই আয়োজনটি আকারে অনেক বড় হয়েছে এবং এটি এখন নতুন নতুন আইডিয়া শেয়ার করার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং তার বাইরের পিছিয়ে পড়া কমিউনিটিগুলোর মধ্যে যে ডিজিটাল ও সুযোগের বৈষম্য রয়েছে, তা দূর করতেই শিক্ষাবিদেরা সেখানে জড়ো হয়েছেন। বড় বড় কোম্পানির তৈরি এই এআই টুলগুলোকে কীভাবে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিয়ে বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে ফেলা যায়, সেটিই ছিল এই সম্মেলনের মূল সুর। প্রযুক্তি যখন ক্লাসরুমের প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে উঠছে, তখন এই ধরনের মেলবন্ধনই পারে শিক্ষার ভবিষ্যৎ বদলে দিতে।