কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আসল চিত্র: কর্পোরেট খতিয়ান এবং তরুণ প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন
বাজারে এআই নিয়ে যত হাঁকডাক আর ভবিষ্যৎবাণী শোনা যায়, বাস্তবের মাটিতে তার প্রয়োগটা ঠিক কেমন? ড্রুইড এআই-এর সদ্য প্রকাশিত ‘২০২৬ এআই অ্যাডপশন বেঞ্চমার্ক রিপোর্ট’ ঠিক এই জায়গাটাতেই আলো ফেলেছে। মানুষের মুখের কথা বা কর্পোরেট কর্তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর ভরসা না করে, এন্টারপ্রাইজ পর্যায়ে এআই এজেন্টরা আসলেই কী করছে, তার একটা নিখাদ ডেটা-ভিত্তিক বিশ্লেষণ উঠে এসেছে এই রিপোর্টে।
জানুয়ারি ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬—এই ১৫ মাস ধরে হেলথকেয়ার, উচ্চশিক্ষা, ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং এইচআর-আইটি সেক্টরের আসল প্রোডাকশন ডেটা ঘাঁটলে এমন কিছু প্যাটার্ন বেরিয়ে আসে, যা এআই অ্যাডপশন নিয়ে আমাদের অনেক চিরাচরিত ধারণাকেই পাল্টে দেয়। ড্রুইড এআই-এর সিইও জোসেফ কিমের মতে, এতকাল আমরা শুধু মানুষের আবেগের ওপর ভিত্তি করে ‘এজেন্টিক এআই’-এর রিপোর্ট দেখেছি। কিন্তু চারটা ভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি আর শত শত এন্টারপ্রাইজ গ্রাহকের ডেটা অ্যানালাইজ করার পর এখন এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে, এআই কোথায় কাজ করছে আর কীভাবে একে দিয়ে কাজ করানো সম্ভব।
ডেটা বলছে, এআই-এর ব্যবহার মূলত আটকে আছে ‘ফ্রন্ট-ডোর ডিমান্ড’ বা প্রাথমিক স্তরের রুটিন কাজগুলোতে। কাস্টমার বা স্টুডেন্ট সার্ভিসিং, পেশেন্ট অ্যাক্সেস, আর সাধারণ ওয়ার্কপ্লেস অপারেশনেই এর আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা উচ্চশিক্ষার মতো সেক্টরগুলোতে মাত্র তিন ধরণের ওয়ার্কফ্লো থেকেই ৯০ থেকে ৯২ শতাংশ ব্যবহার আসছে। তাই এন্টারপ্রাইজ লিডারদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হলো, শুরুতেই খুব জটিল কিছু না ভেবে এই ফ্রন্ট-ডোর ডিমান্ডকে এন্ট্রি পয়েন্ট হিসেবে ধরা। এরপর ধীরে ধীরে ইন্টিগ্রেশন আর পলিসি কন্ট্রোলের মাধ্যমে ভেতরের জটিল কাজগুলোতে এআই-কে যুক্ত করলে আসল ভ্যালুটা পাওয়া যায়।
এখানে একটা বড় ভুল ধারণা হলো ‘কন্টেইনমেন্ট রেট’ (এআই দিয়ে কতগুলো কাজ পুরোপুরি শেষ করা গেল) মাপা। হাই কন্টেইনমেন্ট আসলে মূল লক্ষ্য হতে পারে না, আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘গভর্নড রেজোলিউশন’। অর্থাৎ, এআই নিজে থেকে সঠিক কাজটা করবে, আর যেখানে মানুষের দরকার, সেখানে পুরো কন্টেক্সটসহ কাজটা ট্রান্সফার করে দেবে। উচ্চশিক্ষায় ৯৯.৫% কন্টেইনমেন্ট রেট দেখা যায় কারণ সেখানে মূলত ছাত্রছাত্রীদের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। কিন্তু এইচআর বা আইটি-তে রেটটা ৯৩% এবং হেলথকেয়ারে সেটা ৮৭%; কারণ সিকিউরিটি অ্যাপ্রুভাল বা ক্লিনিক্যাল পলিসি রিভিউর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবেই হিউম্যান স্টাফদের যুক্ত করার নিয়ম রাখা হয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে রিস্ক রিভিউ আর কমপ্লায়েন্সের কড়াকড়ির কারণে এই রেট আরও কমে ৮০% হয়।
এআই আসলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুইভাবে ভ্যালু দিচ্ছে। হেলথকেয়ার বা ফিন্যান্সে এটা ‘কন্টিনিউটি’ বা নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করে, কারণ তাদের ২৯-৩৯% কাজই আসে মূল অফিস সময়ের বাইরে। অন্যদিকে এইচআর বা আইটি-তে অফিস সময়ের বাইরে কাজের চাপ থাকে মাত্র ৬%, কিন্তু সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যেই ২৪% কাজের রিকোয়েস্ট জমা পড়ে। সেখানে এআই মূলত ‘অ্যাবসরপশন’ বা পিক-আওয়ারের এই বিপুল চাপ সামলাতেই বেশি কার্যকরী।
কর্পোরেট দুনিয়ায় এআই-এর এই গোছানো আর সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের চিত্রটা বেশ স্বস্তিদায়ক। কিন্তু এই কর্পোরেট দুনিয়াতেই যারা আগামী দিনে কাজ করতে আসছে, সেই নতুন প্রজন্মের সাথে এআই-এর সম্পর্কটা কেমন? ২০২৬ সালের গ্র্যাজুয়েটিং ব্যাচের দিকে তাকালে একটা অদ্ভুত, প্রায় বিপরীতমুখী চিত্র চোখে পড়ে। একদিকে তারা সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এআই নিয়ে কথা বলা বক্তাদের প্রকাশ্যেই দুয়োধ্বনি দিচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের অ্যাসাইনমেন্ট বা পরীক্ষায় সেই এআই-এর ওপরই ভরসা করছে।
এই তো সেদিন, ইউনিভার্সিটি অফ অ্যারিজোনার সমাবর্তনে গুগলের প্রাক্তন সিইও এরিক শ্মিট যখন এআই-নির্ভর অবশ্যম্ভাবী ভবিষ্যতের কথা বলছিলেন, ছাত্রছাত্রীরা তাকে রীতিমতো দুয়ো দেয়। শ্মিট একটু থেমে বলেছিলেন, “প্রশ্নটা এটা নয় যে এআই পৃথিবীটাকে বদলে দেবে কি না, কারণ সেটা সে দেবেই। প্রশ্ন হলো, আপনারা সেই এআই-কে নিজেদের মতো করে গড়তে পারবেন কি না।” এর কিছুদিন আগেই ইউনিভার্সিটি অফ সেন্ট্রাল ফ্লোরিডাতে রিয়েল এস্টেট এক্সিকিউটিভ গ্লোরিয়া কলফিল্ড যখন এআই-কে ‘পরবর্তী শিল্পবিপ্লব’ আখ্যা দিলেন, দর্শকসারি থেকে একজন ছাত্র চিৎকার করে ওঠে, “এআই সাকস!”
তবে এই প্রকাশ্য ক্ষোভ বা বিতৃষ্ণাই পুরো গল্প নয়। লুমিনা ফাউন্ডেশন-গ্যালাপের গত মাসের ‘২০২৬ স্টেট অফ হায়ার এডুকেশন’ স্টাডি বলছে, ৫৭% আমেরিকান কলেজ শিক্ষার্থী প্রতি সপ্তাহে তাদের পড়াশোনায় এআই টুল ব্যবহার করছে, আর ২০% করছে প্রতিদিন। ব্যবহারটা যে সবসময় নৈতিক গণ্ডির মধ্যে থাকছে, তা-ও নয়। ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির হেলথ ল-এর সহযোগী অধ্যাপক জেকব শেলি তো নিশ্চিত যে তার কোর্সের ফাইনাল এক্সামে অনেকেই এআই দিয়ে চিটিং করেছে। তার ক্লাসের ৮% শিক্ষার্থী মাল্টিপল চয়েস অংশে পারফেক্ট স্কোর পেয়েছে, অথচ রচনা অংশে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছে বা এমন সব বিষয় লিখেছে যা ক্লাসে পড়ানোই হয়নি। শেলির ভাষায়, “২০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে এমন অদ্ভুত রেজাল্ট আমি দেখিনি।” পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে যে, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি তাদের ১৩৩ বছরের পুরোনো ‘অনার কোড’ বাতিল করে আবারও ইন-পারসন এক্সামের দিকে ঝুঁকেছে। স্ট্যানফোর্ডের এক সিনিয়র তো নিউইয়র্ক টাইমসে লিখেই ফেললেন যে, ক্যাম্পাসে চিটিং এখন রীতিমতো ডালভাত হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা একে দেখছেন ‘কগনিটিভ ডিসোন্যান্স’ বা মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন হিসেবে। এই তরুণরাই প্রথম প্রজন্ম যারা তাদের পুরো আন্ডারগ্রাজুয়েট লাইফে চ্যাটজিপিটি-র মতো টুল হাতের কাছে পেয়েছে। গবেষকদের মতে, স্টুডেন্টরা খুব ভালো করেই জানে যে অতিরিক্ত এআই ব্যবহার করলে তাদের ক্রিটিকাল থিংকিং স্কিলে জং ধরবে। কিন্তু তারা এটাও ভাবছে যে, এটা ব্যবহার না করলে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। নিজের ক্ষতি হচ্ছে জেনেও শুধু টিকে থাকার তাগিদে তারা এআই ব্যবহার করে যাচ্ছে।
এই ভীতির পেছনের কারণটা একেবারে অমূলকও নয়। চাকরির বাজার এমনিতেই নড়বড়ে। তার ওপর মার্চ মাসে অ্যানথ্রপিকের রিলিজ করা একটা রিপোর্ট তরুণদের এই ভয়টাকে আরও উসকে দিয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, এআই তাত্ত্বিকভাবে বিজনেস, ফিন্যান্স, লিগ্যাল থেকে শুরু করে অফিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বেশিরভাগ কাজ একাই করে ফেলতে সক্ষম। এমনকি কম্পিউটার ও ম্যাথ প্রফেশনালদের ৯৪% কাজও এআই করে দিতে পারে। যদিও এআই যে সত্যি সত্যিই পুরো লেবার মার্কেট রাতারাতি গিলে খাচ্ছে, তার কোনো সর্বজনীন প্রমাণ এখনও নেই; কিন্তু খণ্ডচিত্রগুলো বেশ ভয়ের। এই বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই টেক দুনিয়ায় এক লাখ দশ হাজারের বেশি কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। স্ন্যাপ-এর মতো কোম্পানি এআই-এর দিকে পুরোপুরি ঝুঁকতে গিয়ে তাদের ১৬% (প্রায় এক হাজার) কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে।